বাজেট ২৫০ মিলিয়ন ডলার। হাতে ৩০০০ বছরের পুরানো এক মহাকাব্য। ক্যারিয়ারের সবচাইতে বড় বাজেটের সিনেমা, তাও একদম নতুন জনরায়! বলতেছি রিসেন্টলি রিলিজ হওয়া ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ওডিসি’র কথা। হোমারের গ্রিক মহাকাব্য নিয়ে বানানো নোলানের ফ্যান্টাসি অ্যাডভান্সড এপিক। চলেন দেখি নোলান এবার আউট অফ দ্য বক্স কি কি করলেন আর কেমন হইলো নোলানের নতুন সিনেমাযজ্ঞ।
নোলান এর আগে বড় ফরম্যাট ইউজ করছেন, কিন্তু পুরা সিনেমা কখনোই আইএমএক্স ক্যামেরায় শুট করান নাই। ‘দ্য ওডিসি’ প্রথম কোনো ফিচার ফিল্ম, যেটার প্রতিটা শট আইএমএক্স ফিল্ম ক্যামেরায় তোলা। এটা সম্ভব করতে আইএমএক্স-কে নতুন রেজলভ করতে হয়েছে মেলা ঝামেলা। নতুন এই ক্যামেরাটার নাম তারা দিছে ‘দ্য কেগলি’, আইএমএক্স-এর পুরনো এক্সিকিউটিভ ডেভিড কেগলির নামে। ঘটনা হইলো, আইএমএক্স-এর স্ক্রিনটা নরমাল স্ক্রিনের চাইতে বড়, একদম ফ্লোর টু সিলিং দেখা যায়। কিন্তু এই আসল ৭০ মিলিমিটার আইএমএক্স ফরম্যাটের জন্য সারা দুনিয়ায় থিয়েটারই আছে মাত্র ৪১ টা! একচুয়াল ফিল্মটা তাই দেখতে পাবে দুনিয়ার অল্প কিছু মানুষ। এই নিয়া মানুষের মধ্যে আছে ক্ষোভ আর ফোমো, ঝগড়াও চলতেছে নেট দুনিয়ায়।
নোলানের পুরানো অভ্যাস যতটা পারা যায় সিজিআই বাদ দিয়া আসল লোকেশন, বাস্তব সেট আর স্টান্ট—এইবারও সেইটাই করছেন নোলান। দুর্গম জায়গায় শুট করতে হইছে, স্টান্টও করতে হইছে বেশ কঠিন লেভেলের। আগের সিনেমাগুলোর মতো এখানেও নোলান তার গল্পের টাইমলাইনটা সরল রাখেন নাই; গেছেন তার চিরাচরিত নন-লিনিয়ার টাইমলাইনে। ট্রয়ের যুদ্ধ আর ট্রোজেন হর্সের ফ্ল্যাশব্যাক, ক্যালিপসোর সাথে ওডিসিয়াসের সময় আর তার স্মৃতি ফিরা পাওয়ার স্ট্রাগেল—গরমের চমক ধইরা রাখতে সব ইভেন্ট আগু-পিছু কইরা একটা সরল জার্নিরে জটিল বানাইছেন নোলান। এইবার চলেন দেখি নোলানের এই ওডিসি কোন কোন দিক দিয়া হোমারের ওডিসি থেইকা আলাদা?
গ্রিক মিত্রে বাস্তব ঘেঁসা কইরা দেখাইতে নোলান ইন্সপায়ার্ড হইছেন এমিলি উইলসনের ওডিসি অনুবাদ থেইকা, যেটা বেশ মর্ডান আর অনেক সহজ ভাষায় লেখা। স্ক্রিপ্টে একটা জিনিস বেশ চোখে পড়ার মতো—সংলাপগুলো একদম মর্ডান, প্রায় ইনফরমাল ইংরেজির মতো। প্রাচীন গ্রিক ব্যাকগ্রাউন্ডে মর্ডান আমেরিকার ডায়লগ, যেটা অনেকের কাছে বেমানান আর অস্বস্তিকর লাগছে; কিন্তু গল্প যত আগায়, ততই একটা সমসাময়িক ফিল দেয় এইটা।
হোমারের মূল ওডিসির কঙ্কালটা ঠিক রাইখা নোলান বেশ কিছু বড়সড় পরিবর্তন আনছেন। অলিম্পাস পর্বতের দেবতাদের গল্প থেকা বাদ দিছেন। চরিত্রদের মুখে দেবতাদের কথা শোনা গেলেও অলিম্পাসের কোনো দৃশ্য নাই। শুধু এথেনারে মাঝেমধ্যে রহস্যময় রূপে পর্দায় দেখা যায়। নরখাদক দৈত্যদেরও নোলান বদলায় দিছেন বর্ম পরা দানব আর নাইটে। বাদ দিছেন তাদের হিংস্রতাও।
ফ্যামিলি বন্ডিংয়ের জায়গায়ও নোলান মর্ডার্ন পার্সপেক্টিভ আনছেন। মূল কাব্যের প্যাট্রিয়ার্কাল কাঠামো এড়ায়া মা-ছেলের সম্পর্কের সমীকরণ উল্টায় দিছেন তিনি। সিনেমার পেনেলোপি হোমারের পেনেলোপির চাইতেও স্ট্রং। আবার মূল কাব্যের ওডিসিয়াস পাইলসে যান না, কিন্তু সিনেমায় তিনি নিজেই সেখানে গিয়ে ছেলের সাথে দেখা করেন।
সিনেমায় ওডেসিয়াস হইছেন ম্যাট ডেমন। সাথে আছেন টম হল্যান্ড, অ্যান হ্যাথাওয়ে, জেন্ডায়া, রবার্ট প্যাটিসন—এ যেন তারকার মেলা। তবে সবচাইতে বেশি কথা হইতেছে হেলেন চরিত্রে কাস্ট করা কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেত্রী লুপিতা ইয়ংওংকে নিয়া। হেলেনা একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী, এইটাই মানতে পারতেছে না দর্শকদের একটা অংশ।
স্ক্রিনে অতিরিক্ত ভায়োলেন্স আর রক্তারক্তি পছন্দ করেন না নোলান। গ্রিক মিথোলজির পশুবলির দৃশ্য কিংবা বিভৎস খুন-খারাবি তাই সরাসরি দেখান নাই তিনি। ক্যামেরা এঙ্গেল আর শ্যাডোর মাধ্যমে তা কৌশলে আড়াল করছেন নোলান।
ভালো আর মন্দ—দুই ধরনের রিভিউই পাইতেছে নোলান আর ‘দ্য ওডিসি’। রটেন টমেটোজের রিভিউয়াররা বলতেছে, সিনেমার অরিজিনালিটি আর ক্রাফট একদম টপ নচ। হয়তে ভ্যান হোয়াইট হ্যামারের সিনেমাটোগ্রাফি অনেক রিয়েল আর পাওয়ারফুল। অনেকেই সিনেমার ইমোশনাল মোমেন্টগুলার ক্রেডিট দিতেছে লুডভিগ গোরানসনের মিউজিকরে।
অন্যদিকে, টাইম ম্যাগাজিনের এক রিভিউতে বলা হইতেছে, আইএমএক্স-এর ভিজুয়াল নাকি ঘোলাটে আর হতাশাজনক। সিনেমার পেসিং স্লো—এটা নিয়েও সমালোচনা করতেছে কোনো কোনো দর্শক। আবার কারো কারো মতে, আধুনিক আমেরিকান কথ্যভাষায় ডায়লগ প্রাচীন গ্রিক প্রেক্ষাপটে একদমই বেমানান আর হাস্যকর।
‘দ্য ওডিসি’ নোলানের অন্য সিনেমাগুলো থেকা আলাদা হয়েই থাকবে। এটা তার প্রথম ফ্যান্টাসি জনার কাজ, প্রথম পুরাপুরি আইএমএক্স ফিল্মে শুট করা সিনেমা। আর নিজের ট্রেডমার্ক নন-লিনিয়ার ও সাইকোলজিক্যাল স্টাইলটা গ্রিক মিথের সাথে মিলায়া একটা সাহসী এক্সপেরিমেন্ট।
Leave a Reply