View: 1

মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়া কেন এত ক্যাচাল?

ইতিহাস, রাজনীতি আর সংস্কৃতির মারপ্যাঁচে মঙ্গল শোভাযাত্রা আজ শুধুই একটি বৈশাখী উৎসব নয়, বরং ক্ষমতার পালাবদল ও প্রতিবাদের এক জীবন্ত রাজনৈতিক দলিল।
আর্ট-কালচার

১৯৮৬ সালে যশোরে প্রথম বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা হয়। আয়োজন করে চারুপিট নামের যশোরের একটা সাংস্কৃতিক সংগঠন। এই শোভাযাত্রা পপুলার হইলে ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটের স্টুডেন্টরা ১৯৮৯ সালে আয়োজন করে আনন্দ শোভাযাত্রা। ১৯৯০-এ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় স্বৈরাচাররে অমঙ্গল হিসেবে চিহ্নিত কইরা মঙ্গলের আহ্বানে শোভাযাত্রার নাম করা হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।

কিন্তু আর্কাইভ ঘাটলে আপনি এই দাবির প্রমাণ পাবেন না! ‘ইনকিলাব’ পত্রিকায় প্রথমবারের মতো ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নাম পাওয়া যাইতেছে ১৯৯৮ সালে, তাও বর্ষবরণ উৎসব লেইখা ব্র্যাকেটে লেখা হয়েছে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। কিন্তু এর আগের কোনো পত্রিকায় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র উল্লেখ না থাকলেও ওই সময়ের আয়োজকরা বলতেছে, মূলত ১৯৯০-এর স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে আনন্দ শোভাযাত্রা হয়ে ওঠে মঙ্গল শোভাযাত্রা।

১৯৯১ থেকে ১৯৯৬-এ বিএনপির সময়কালে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না এই পত্রিকাগুলায়। ফলে এই সময় আনন্দ শোভাযাত্রাও হয়ে থাকতে পারে, আবার মঙ্গল শোভাযাত্রাও হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু ওই সময়ে ‘মঙ্গল’ নামের কোনো আলামত নাই। তাইলে আন্দাজ করা যায়, আয়োজকরা এই নামরে আর জরুরিভাবে নেয় নাই, ভাবে নাই। কারণ স্বৈরাচার উৎখাতের পর রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হইছে। তাইলে রাজনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় বা রাষ্ট্রে জনগণের মালিকানা আছে নাকি স্বৈরাচারের বেদখলে আছে—তার সাথে মিল রাইখা কখনো আনন্দ, কখনো মঙ্গল ব্যবহার করা হইছিল।

যেভাবে বিতর্কিত হইলো মঙ্গল শোভাযাত্রা: ১৯৯৯ সাল থেকে জনকণ্ঠ, ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন পত্রিকা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ লিখতে শুরু করে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মঙ্গল শোভাযাত্রার নামের আলামত পাওয়া যায়। ১৯৯৯ সালের ‘ডেইলি জনকণ্ঠ’ মোতাবেক—মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাস প্রতিরোধের শপথ নিয়ে আয়োজিত হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। তার মানে, ১৯৯০ সালে অমঙ্গল অর্থ ছিল গণতন্ত্র না থাকা, রাষ্ট্র জনগণের মালিকানার বদলে স্বৈরাচারের বেদখলে থাকা। আর ১৯৯৯ সালে সেটা পাল্টাইয়া অমঙ্গল মানে সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদের রূপ নেয়।

এখন আমরা বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক-সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের খেয়াল করলে দেখব, তারা ঢালাওভাবে মুসলমান এবং ইসলামরে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদ বলে চিহ্নিত কইরা থাকে। এ তালিকায় আছে হুমায়ুন আজাদ, তসলিমা নাসরিন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আবুল বারাকাত, ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, আবদুল্লাহ আবু সাঈদ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। এই সময়ে নাটক-সিনেমায় রাজাকার দেখাইতে শুরু হয় দাড়ি-টুপির ঢালাও ব্যবহার। অবশ্য বাস্তবে রাজাকারের বা আল-বদরের অনেক সদস্য ছিল যাদের দাড়ি ছিল না, টুপিও পরত না; এমনকি পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে বৌদ্ধরাও ছিল!

এইভাবে মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা এবং ইসলাম সমর্থক হয়ে উঠতে থাকায় বহু মুসলমান মঙ্গল শোভাযাত্রার ভেতরে হিন্দু ধর্মের মোটিভ ও মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যের ধর্মভাবনা খেয়াল করতে শুরু করে, আপত্তি জানাতে শুরু করে। কিন্তু এ আপত্তির ভিন্ন ফর্মের শুরু আসলে আরও আগে থেকে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের আইকন শরৎচন্দ্র তার বইতে ফুটবল খেলার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলতেছে—বাঙালি বনাম মুসলমানের খেলা! এইভাবে কলকাতার হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা হিন্দু এবং বাঙালিকে সমার্থক হিসেবে দেখতেছে এবং দেখাইতেছিলও। সেইখান থেকে শরৎচন্দ্রদের প্রতিষ্ঠা করা জাতিগত পরিচয়-ভাবনা মোতাবেক বহু মুসলমান নিজেদের বাঙালি কালচারের বাইরে ভাবা শুরু করে। বাঙালি কালচার মানেই যেন বা হিন্দু কালচার! ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কালচারাল ইভেন্ট হিসেবে যখন মঙ্গল শোভাযাত্রা উদযাপন হইতেছিল, তখন তারা এইটার সাথে নিজেদের রিলেট করতে পারে নাই।

এইভাবে ‘মঙ্গল’ শব্দটা ও শোভাযাত্রার মোটিভ নিয়ে দেশে একটা বিভাজন, ফ্যাসাদ ও দুশমনি দানা বাঁধে। সমালোচনা ডিনাই করা ছাড়াইয়া এইটারে ঠেকানোর এজেন্ডা নিয়ে এখনো অ্যাক্টিভ আছে দেশের বড় একদল মানুষ। ঠেকানোর এই পলিটিক্স এতই শক্তিশালী যে, দুই-তৃতীয়াংশ মেজরিটির বিএনপি সরকার ‘মঙ্গল’ শব্দটা রাখার ঘোষণা দিয়াও বাদ দিছে!

এখন আমরা একটা থট এক্সপেরিমেন্ট করতে পারি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর বাংলাদেশ হাসিনার বেদখলে। পরের ১৪ এপ্রিল মঙ্গল শোভাযাত্রা হইতেছে। শোভাযাত্রায় অমঙ্গল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে শেখ হাসিনারে। দেশে গণতন্ত্র নাই, রাষ্ট্র জনগণের মালিকানায় নাই। তাই গণতন্ত্র চাইয়া পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিজমের মর্মে এই শোভাযাত্রা হইতেছে। এখানে মোটিভ হিসেবে আছে সাপের চামড়া, পাইকারি খুনের রক্ত ছড়ানো-ছিটানো, জুতা, রাস্তায় পড়ে থাকা টুপি-পাঞ্জাবি পড়া লাশ। তখন ওই শোভাযাত্রায় কতটা হিন্দুয়ানি পাইতো হেফাজতে ইসলাম? মঙ্গল শোভাযাত্রার মর্মে তার আদি গণতান্ত্রিক ভাষণ হাজির থাকলে এটারে ঠেকাবার পলিটিক্স দেশের সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে কতটা আবেদন পয়দা করতে পারতো?

মঙ্গল কামনা সমাজে খুবই সাধারণ ঘটনা, সকলেই করে। কেউ দোয়া করে, কেউ পূজা প্রার্থনা করে, কেউ জাস্ট বলে “ভালো থাইকো”। কেউ হিন্দু, কেউ মুসলমান, কেউ খ্রিস্টান, কেউ বৌদ্ধ বা নিরীশ্বরবাদী—যার যার খোদার কাছে মঙ্গল কামনায় ইবাদত করতে পারে। পহেলা বৈশাখ বা যেকোনো উৎসবে একটা জনগোষ্ঠী তার কালচারাল এক্সপ্রেশন নিয়ে হাজির হয়। এই জনগোষ্ঠীর ভিতরে বহু ধর্ম থাকতে পারে, বহু জাতি থাকতে পারে। তারা ঝগড়াফ্যাসাদও করতে পারে, শান্তিতে পাশাপাশিও থাকতে পারে। কোনো এক পক্ষের দুশমনি বহাল রাইখা শান্তি আশা করা যায় না।

আর নামের ক্ষেত্রে আনন্দ এবং মঙ্গল দুইটাই থাকতে পারে—কখনো আনন্দ, কখনো বা মঙ্গল। ইতিহাস থেকে আমরা দেখতেছি, এটা নিতান্তই একটা কালচারাল উৎসব না, বরং রাষ্ট্র এবং গণতন্ত্রের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত একটা পলিটিক্যাল-কালচারাল ইভেন্ট। এইটা যখন সেই আদিমর্ম থিকা দখলদার স্বৈরাচারের লগে খাতির করা শুরু করে, জনগণের বেশিরভাগের লগে দুশমনের ভিতর দিয়া উদযাপন করতে চায়, তখন জনগণ দুশমনেই ফেরত দেয়। গণতন্ত্রের বাসনায় এইটা মঙ্গল হয়েছিল, সেইখানে জনগণ শরিক হয়েছিল। তারপর এইটা যখন অ্যান্টি-ডেমোক্রেটিক হয়ে উঠতে থাকে, তখন বিতর্ক শুরু হয়। সমাজের এক বড় দল এইটা ডিনাই করা শুরু করে, তারপর শুরু হয় ঠেকানোর পলিটিক্স। এই রাজনীতির ভিতরের পলিটিক্স বুঝলেই সকলের মঙ্গল। আনন্দ।

দিন দুনিয়া

Leave a Reply

dinduniya

Share with