View: 5

সিলসিলা: সুফি তরিকার গ্লোবাল হিস্ট্রি | এপিসোড ৩

তারা গান করে না, নাচে না, উচ্চস্বরে আল্লাহর নাম নেয় না। তারা শুধু ভেতরে তাকায়। যেই দুনিয়া সবসময় চিৎকার করে মানুষের মনোযোগ চায়, সেই দুনিয়াতেই একটা সুফি তরিকা চাইছিল...
সিলসিলা
তারা গান করে না, নাচে না, উচ্চস্বরে আল্লাহর নাম নেয় না। তারা শুধু ভেতরে তাকায়। যেই দুনিয়া সবসময় চিৎকার করে মানুষের মনোযোগ চায়, সেই দুনিয়াতেই একটা সুফি তরিকা চাইছিল নীরবতা। ৭০০ বছর ধরে এই তরিকা মুঘল দরবার থেকে ককেশাসের পাহাড়, অটোমান সাম্রাজ্য থেকে আজকের ডিজিটাল দুনিয়া পর্যন্ত একটার পর একটা ইতিহাস বদলাইছে। এই তরিকারে বলা হয় ‘সোবার সুফিজম’ বা শান্ত সুফিবাদ। এই তরিকার নাম নকশবন্দীয়া।
১৪ শতকের মধ্য এশিয়া। বুখারার কাছে একটা ছোট্ট গ্রাম কাসর-ই আরিফান। এইখানে ১৩১৮ সালে জন্ম নেন বাহাউদ্দিন নকশবন্দ। নকশবন্দ মানে যিনি হৃদয়ে আল্লাহর নাম খোদাই করেন। তরুণ বয়সে তিনি তিনজন আলাদা পীরের কাছে শিক্ষা নেন— কারো কাছে মাত্র কয়েক মাস, কিন্তু শেখার গভীরতা ছিল এমন যে তার মৃত্যুর পরে তার নাম ধারণ করে গড়ে ওঠে ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী আধ্যাত্মিক তরিকাগুলোর একটা।
অন্য সুফি তরিকা থেকে নকশবন্দীয়াদের আলাদা করার একটা সহজ উপায় আছে। যদি দেখেন তারা গাইতেছে না, নাচতেছে না, চিৎকার করতেছে না, তাহলে খুব সম্ভব তারা নকশবন্দী। তাদের জিকির হয় নীরবে, হৃদয়ের ভেতরে, জিবও নড়ে না। বিখ্যাত সুফি পন্ডিত জামি লিখছেন, নীরব জিকির এইজন্য করা হয় যাতে মানুষের জিব বাইরের কাজে ব্যস্ত না হয়ে সম্পূর্ণ মনোযোগ অন্তরের দিকে দিতে পারে। অন্য সুফি তরিকায় যেখানে সংগীত বা উচ্চস্বরের জিকির আল্লাহর দিকে নিয়ে যাওয়ার পথ, নকশবন্দীদের কাছে সেই পথটাই ভেতরের নীরবতা।
এই তরিকার আরেকটা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো সিলসিলা। অধিকাংশ সুফি তরিকার সিলসিলা হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর মাধ্যমে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত যায়। নকশবন্দীরা গেছে প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর মাধ্যমে— যিনি ছিলেন নবীজির সবচেয়ে কাছের সাথী, যার পরিচয় ছিল গাম্ভীর্য আর গোপন তাকওয়ায়। এই সিলসিলারে বলা হয় ‘গোল্ডেন চেইন’ বা স্বর্ণ শৃঙ্খল। শরীয়ত এই তরিকায় কোনো বাধা না, বরং শরীয়তই হইলো সেই বাহন যার মধ্যে দিয়ে আধ্যাত্মিক উপলব্ধি আসে। বাহাউদ্দিনকে তাই বলা হইত দুই ডানার অধিকারী— শরীয়তের বাহ্যিক জ্ঞান আর তরিকার ভেতরের জ্ঞান, দুইটাই ছিল তার মধ্যে।
নকশবন্দীদের মূল মন্ত্র হলো, “বাহিরে মানুষের সাথে থাকো, ভেতরে আল্লাহর সাথে থাকো।” এইটারে বলে ‘খালওয়াত দার আঞ্জুমান’— জনতার মাঝে নির্জনতা। একবার এক আমির বাহাউদ্দিনকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার তো কোন জিকিরের আওয়াজ নাই, কোন সুর-সংগীতও নাই, আপনার পথটা আসলে কি?” তিনি শান্তভাবে জবাব দেন, “বাহিরে মানুষের সাথে, ভেতরে আল্লাহর সাথে।”
বুখারা থেকে শুরু হইয়া এই তরিকা অবিশ্বাস্য গতিতে ছড়ায়ে পড়ে বণিক, আলেম আর দরবেশদের হাত ধইরা। এই বিস্তারের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল বাহাউদ্দিনের শিষ্য ওবায়দুল্লাহ আহরারের। তিনি একটা উল্টা সমীকরণ তৈরি করলেন। ‘সুফি মানে দরিদ্র’— এই ধারণা ভেঙে দিয়ে ট্রান্সঅক্সানিয়ার সামাজিক, রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়াইলেন। হইলেন সেই অঞ্চলের অন্যতম ধনী মানুষ, কিন্তু তার আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব ছিল প্রশ্নাতীত। নকশবন্দী খানকাগুলা শুধু ইবাদতের জায়গা ছিল না, এগুলার মধ্যে দিয়া তারা মধ্যস্থতা করত, রাজনৈতিক বিরোধ মিটাইতো, শরীয়ত আইন বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখতো। এইটা ছিল এক ধরনের সমান্তরাল রাষ্ট্র কাঠামো।
ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টে পৌঁছানোর পর এই তরিকার সামনে পড়লো একটা বড় পরীক্ষা। সম্রাট আকবর তখন বানাইতেছেন ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’— হিন্দু, মুসলিম আর অন্যান্য বিশ্বাসের একটা মিশ্রিত ধর্ম। দরবারে তখন চিশতি আর কাদেরী তরিকার প্রভাব, নকশবন্দীরা ছিলেন সংখ্যালঘু। এই মুহূর্তে সামনে আসলেন শায়খ আহমদ সিরহিন্দিকে— ইতিহাস যাকে চেনে ‘মুজাদ্দিদ আলফ সানি’ (দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সংস্কারক) নামে। তিনি শুধু আধ্যাত্মিক শিক্ষক ছিলেন না, একজন তাত্ত্বিক যোদ্ধাও ছিলেন।
বিখ্যাত সুফি দার্শনিক ইবনে আরাবির মত ছিল ‘ওয়াহদাতুল উজুদ’— সৃষ্টি আর সৃষ্টিকর্তার মধ্যে আলাদা কিছু নেই, সব একই অস্তিত্ব। সিরহিন্দী বললেন না, তাদের মধ্যে ফারাক আছে। এই ফারাকটাই শরীয়তের জায়গা তৈরি করে। এই নতুন তত্ত্বের নাম ‘ওয়াহদাতুল শুহুদ’। দার্শনিক বিতর্কের পাশাপাশি এইটা ছিল একটা রাজনৈতিক সংগ্রামও, কারণ দ্বীন-ই-ইলাহীর পেছনে ছিল ওয়াহদাতুল উজুদের দার্শনিক ভিত্তি।
সিরহিন্দি মুঘল আমির-ওমরাদের কাছে লিখলেন ৫৩৬ টা চিঠি, ইসলামী বিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে। এই চিঠিগুলার সংকলনের নাম ‘মাকতুবাতে ইমাম-ই রব্বানী’। এর ফল হইলো, সম্রাট জাহাঙ্গীর তাকে গোয়ালিয়র দুর্গে বন্দি কইরা রাখলেন দুই বছর। কিন্তু পরে নিজের ভুল বুঝতে পারলেন, মুক্তি দিলেন সিরহিন্দিকে, আর আকবরের চালু করা অনেক অইসলামী নিয়ম বাতিল হইলো। এই ঘটনার পর নকশবন্দী তরিকায় যুক্ত হইলো একটা নতুন পরিচয়— ‘মুজাদ্দেদিয়া’। আজও এইটা এই তরিকার সবচেয়ে বড় শাখা। পরবর্তীকালে সম্রাট আওরঙ্গজেব এবং তার উত্তরসূরীরা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন এই নকশবন্দী দর্শনে। দক্ষিণ এশীয় ইসলামের ইন্টেলেকচুয়াল আর পলিটিক্যাল গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে সিরহিন্দির ভূমিকা আজও ঐতিহাসিকদের কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।
১৮০০ শতকে আরেকটা বড় রূপান্তর ঘটে। কুর্দিস্তান থেকে আসা শায়খ খালিদ আল-বাগদাদী এই তরিকারে একটা আধুনিক নেটওয়ার্কের মতো বানাইলেন। দামেস্কে প্রতিষ্ঠা করলেন বিশাল লাইব্রেরি আর মাদ্রাসা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠাইলেন ১১৬ জন খলিফা— উসমানী সাম্রাজ্য থেকে ইন্দোনেশিয়া, আফগানিস্তান পর্যন্ত। ইস্তাম্বুলে খালি এই তরিকারই ছিল ৬০ টার বেশি তেক্কে বা খানকা— ধনী-গরীব এক টেবিলে বসার জায়গা।
খালিদিয়া শাখার সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায় ঘটে ককেশাসে। ১৮৩৪ থেকে ১৮৫৯ সাল পর্যন্ত ইমাম শামিল রুশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগঠিত করলেন ‘মুরিদবাদ’ নামে। পীর-মুরিদের আধ্যাত্মিক বন্ধনকে রাজনৈতিক সংগঠনের হাতিয়ার বানাইলেন। বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি ট্রাইবগুলারে একটা সাধারণ পরিচয়ের নিচে আনা হলো, প্রচলিত ট্রাইবাল আইনের বদলে শরীয়াহ আদালত প্রতিষ্ঠা করলেন। এইটা ছিল একটা স্টেট বিল্ডিং প্রজেক্ট। এর বাইরেও ইন্ডিয়ায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, ইরাকে গোপন রাজনৈতিক দল, জিনজিয়াঙে চিং ডাইনেস্টির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ— নীরব জিকিরের এই তরিকা ইতিহাসে কতটা সরব ছিল, এই তালিকাটাই তার প্রমাণ।
এই পথটা পুরোপুরি বুঝতে হলে দুইটা বড় তরিকার সাথে তুলনা দরকার। মেভলেভিরা পরিচিত তাদের ঘূর্ণন নৃত্যের জন্য; সুর আর আত্মবিলোপে তারা মুক্তি খোঁজে। নকশবন্দীরা ঠিক বিপরীত— গান, নাচ সম্পূর্ণ বর্জন করে নীরব, নিশ্চল হৃদয়ে খোঁজে পরম অবস্থা। এই পার্থক্য আসছে ভূগোল থেকেও; মেভলেভি তরিকা গড়ে উঠছে আনাতোলিয়ার সংস্কৃতি-সমৃদ্ধ জগতে, নকশবন্দীয়া গড়ে উঠছে মধ্য এশিয়ার কঠোর, রুক্ষ পরিবেশে।
আর কাদেরিয়া তরিকার সাথে পার্থক্য আরো সূক্ষ্ম। কাদেরীদের জিকির উচ্চকণ্ঠ, সমাজমুখী; তারা জনঘনিষ্ঠ সমাজসেবায় বিশ্বাসী। নকশবন্দীরা নীরব, কিন্তু সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে জড়িয়ে ভেতর থেকে বদলানোর চেষ্টা করছে। সিলসিলায়ও পার্থক্য— কাদেরিয়া আলী রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর মাধ্যমে, নকশবন্দীরা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর মাধ্যমে। মুঘল দরবারে চিশতিয়া যেখানে সংগীতের মাধ্যমে হৃদয় জয় করছে, নকশবন্দীরা সেখানে চিঠি আর তত্ত্বের মাধ্যমে নীতি বদলানোর চেষ্টা করছে।
এইবার আসা যাক এই তরিকার ভেতরের কাঠামোয়। নকশবন্দিয়ার মূলনীতি ১১ টা, যারে বলে ‘কালিমাতে কুদসিয়া’ বা পবিত্র বাণী। প্রথম আটটা দিছেন আবদুল খালেক গুঝদাওয়ানী, শেষ তিনটা যুক্ত করছেন বাহাউদ্দিন নিজে। প্রথম নীতি ‘হোশ দর দম’— প্রতিটা শ্বাসে সচেতন থাকা। বাহাউদ্দিন বলতেন, এই তরিকার পুরো ভিত্তি দাঁড়ায় আছে শ্বাসের উপর; প্রতিটা শ্বাস যেন হয়ে ওঠে আল্লাহর স্মরণের বাহন। দ্বিতীয় ‘নজর বার কদম’— হাঁটার সময় চোখ পায়ের দিকে রাখা, যাতে বাহ্যিক দৃশ্য হৃদয়ের একাগ্রতা না ভাঙ্গে। চতুর্থ নীতিটা সবচেয়ে পরিচিত— ‘খালওয়াত দার আঞ্জুমান’ (লোকালয় থেকেও মনে মনে আল্লাহর সাথে নির্জনতা)।
এই তরিকার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হইলো ‘রাবিতা’— শায়খ আর মুরিদের মধ্যে হৃদয়ের সংযোগ। এই সংযোগ কতটা গভীর হইতে পারে সেই বিষয়ে একটা গল্প বলি। বাহাউদ্দিনের এক মুরিদ মোহাম্মদ জাহিদ বসন্তকালে মনে মনে তরমুজ খেতে চাইলেন। বাহাউদ্দিন তাকে বললেন, “ওই কাছের নদীতে যাও, গিয়া দেখো কি পাও।” তিনি গেলেন, ঠান্ডা পানিতে হাত দিতেই পাইলেন একটা তাজা তরমুজ! মুরিদের অব্যক্ত চাওয়া মুর্শিদ জানেন— এই বিশ্বাসটাই রাবিতার ভিত্তি।
মানুষের ভেতরে আছে ছয়টা সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক কেন্দ্র বা ‘লতিফায়ি সিত্তা’— কলব (হৃদয়), সির (গোপন রহস্য), রুহ (আত্মা), খফি, আখফা আর নফস। মুর্শিদের দেখানো আমলের মাধ্যমে এই কেন্দ্রগুলো ধাপে ধাপে জাগে। এই জাগরণের শীর্ষে পৌঁছাইলে হয় ‘ফানা’— আল্লাহর সত্তায় অহংয়ের বিলোপ। তারপর আসে ‘বাকা’— যেইখানে স্বার্থপর অহংকারটা চইলা যায়, কিন্তু রুহ বিরাজ করে এক পরম শান্তিতে। প্রতিটা কাজ তখন খাঁটি ভালোবাসায় ভইরা ওঠে। এই জার্নিটা নিয়ে যায় মারিফতের দিকে— এমন এক উপলব্ধি যা বুদ্ধির সীমা ছাড়ায়ে যায়।
আজও এই নীরব সুফিদের পথ একদমই নীরব নয়। শায়খ নাজিম আল-হাক্কানীর হাতে গড়া হাক্কানিয়া শাখা আজ যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় সক্রিয়। তাদের অনলাইন সোহবত বা মজলিসে লাখো মানুষ যুক্ত হয় প্রতিদিন। সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর আর জহুর বারুতে তাদের জাউয়াগুলো কাজ করছে অভিবাসী মুসলমানদের জন্য পোর্টেবল আধ্যাত্মিক আশ্রয়স্থল হিসেবে।
ইসলামী কাজকর্মের উপরে তুরস্কে আতাতুর্কের নিষেধাজ্ঞার পর নকশবন্দী চলে গিয়েছিল আন্ডারগ্রাউন্ডে। পরে আন্ডারগ্রাউন্ড থেকেই বাইর হইল নাজমুদ্দিন এরবাকানের ‘মিলি গোড়ুশ’ আর বর্তমান এরদোয়ানের একেপি পার্টির মূল রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক। ভেতর থেকে বদলানোর সেই নকশবন্দী দর্শন ‘খালওয়াত দার আঞ্জুমান’ আজও কার্যকর— তেক্কে থেকে শুরু কইরা তাদের বিচরণ এখন পার্লামেন্ট পর্যন্ত।
এই অবিরাম কোলাহল আর ডিস্ট্রাকশনের যুগে নিজের ভেতরের নীরবতার আসলে কতটা শক্তি থাকতে পারে? নকশবন্দীয়ার ৭০০ বছরের ইতিহাস বলতেছে, অনেক। মুঘলদের নীতি বদলাইছে, রুশ এম্পায়ারের বিরুদ্ধে দাঁড়াইছে, তুরস্কে সরকার বদলাইছে, ডিজিটাল দুনিয়ায় লাখো মানুষ খুঁজে পাইতেছে আধ্যাত্মিক শিখর। আর এই পুরাটাই ঘটছে কোন উচ্চস্বর ছাড়া।
শেষ করি একটা গল্প দিয়া। তরুণ বয়সে বাহাউদ্দিন নকশবন্দের মনে একটু অহংকার ছিল। একদিন বাহাউদ্দিনের মুর্শিদ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি নিজের সাথে কেমন ব্যবহার করো?” বাহাউদ্দিন তখন বেশ গর্ব করে সুফিদের টেক্সটবুক আনসারটা দিলেন, “আমি যদি খাবার বা আল্লাহর দয়া পাই তবে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি, আর যদি কিছু না পাই তবে ধৈর্য ধরি।” মুর্শিদ হাইসা বললেন, “সুখে খোদার শুকরিয়া আদায় করা আর দুঃখে ধৈর্য ধরা তো রাস্তার পশুরাও করে, আসল সাধনা হইলো নিজের অহংকার ভাঙ্গা।”
গুরুর কথায় বাহাউদ্দিন তার স্বাদের বইপত্র ফেলে মানুষের সেবা শুরু করলেন। অনেকদিন সেবার পর গুরু তাকে বললেন জীবজন্তুর সেবা করতে, নিজেকে তাদের চেয়ে ছোট ভাবতে। বাহাউদ্দিন এতটাই বিনয়ী হইলেন যে রাস্তায় কোন পশু দেখলে নিজে পাশে সইরা দাঁড়ায় তাকে আগে যেতে দিতেন। এরপর তার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা শুরু হইল— মুর্শিদ তাকে রাস্তায় বেওয়ারিশ কুকুরের সেবা করতে বললেন। লোকে কুকুর পছন্দ করত না, কিন্তু বাহাউদ্দিন তাদের মাঝেও আল্লাহর সৃষ্টির সৌন্দর্য দেখতে পাইলেন।
তীব্র শীতের একদিন ভাঙ্গা একটা আঙ্গিনায় এক রুগ্ন কুকুরের সাথে তার দেখা হইল। কুকুরটারে দেইখা তার মনে ভালোবাসার এক জোয়ার বয়ে গেল। তখনই তিনি মাটিতে বইসা পড়লেন আর অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। বাহাউদ্দিনকে এই দশায় দেইখা কুকুরটা চিত হয়ে শুয়ে পড়ে, তার থাবা দুইটা আকাশের দিকে তুইলা এক করুণ সুরে কেঁদে উঠে। কুকুরটা যেন আল্লাহর কাছে নিজের ভাষায় দোয়া করতেছে! এই দৃশ্য দেখে বাহাউদ্দিনের বুক কাইপা উঠল, তিনিও হাত তুইলা কুকুরের সাথে সুর মিলায়ে কাঁদতে লাগলেন আর বলতে লাগলেন, “আমিন, আমিন।”
একসময় কুকুরটা শান্ত হইল, আর ঠিক তখনই বাহাউদ্দিনের ভেতর থেকে ‘আমি’ নামের অহংকারটুকু চিরতরে মুছে গেল। ঠিক এই মুহূর্তেই তার স্পিরিচুয়াল ওপেনিং হইল।

দিন দুনিয়া

Leave a Reply

dinduniya

Share with