View: 9

জুলাই ২৪: হাসিনার ধোঁকাবাজির ১০ দিন

৫ জুনের এক ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ এক মাসের মাঝেই হয়ে উঠলো উত্তাল দাবানল,সেন্ট্রাল লাইব্রেরি থেকে রাজু, রাজু থেকে শাহবাগ—প্রতিটি রাজপথ আর ক্যাম্পাস গর্জে উঠলো স্বৈরাচার পতনের দামামা বাজিয়ে।
পলিটিক্স

৫ জুন যে আগুনটা একটা ছোট্ট স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলতেছিলো, সেইটা এক মাসের মধ্যেই দাবানল হয়া গেলো। সেন্ট্রাল লাইব্রেরি থিকা রাজু ভাস্কর্য, রাজু থিকা শাহবাগ আর শাহবাগ থিকা সারাদেশ—প্রতিটা ক্যাম্পাস, প্রতিটা রাস্তার মোড়, প্রতিটা রেললাইন হয়া উঠলো প্রতিবাদের ভাষা। ৬ থেকে ১৫ জুলাইয়ের দিনগুলা ছিল এমন এক সময়, যেখান থিকা আন্দোলন আর পিছে ফিরে তাকায়নি।

৬ জুলাই (শনিবার): ‘বাংলা ব্লকেড’ ঘোষণা

বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে স্টুডেন্টরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে থেকে মিছিল নিয়ে শাহবাগ যায় এবং বিকেল সাড়ে চারটা থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত শাহবাগ অবরোধ করে। ঢাকার অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলাও ইতিমধ্যে আন্দোলনে যুক্ত হইছে। কীভাবে আন্দোলন আরো বড় পরিসরে করা যায় তা ভাবতে থাকে সমন্বয়কেরা। আসিফ মাহমুদের দাবি, ৬ জুলাই সন্ধ্যায় সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদের সাথে মাহফুজ আলমের দেখা হয় টিএসসিতে। মাহফুজ আলম ‘বিডি ব্লকেড’ নামটা প্রস্তাব করেন পরের দিনের কর্মসূচির। কার্জন হলের সিড়িতে সংগঠকদের আলোচনায় নামটা প্রস্তাব আসে বিডি ব্লকেডের বদলে বাংলা ব্লকেড নাম রাখার। আসিফ মাহমুদ তার জুলাই বইয়ে আরো লিখছেন যে তারা সিদ্ধান্ত নেন, পরদিন, ৭ জুলাই বেলা সাড়ে ৩টা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে জমায়েত হয়ে শাহবাগে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি শুরু হবে, এবং একই সময়ে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজেও এই কর্মসূচি পালিত হবে। সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনেরও ঘোষণা দেন সেদিন। রাতের বেলা ব্লকেড শেষে টিএসসিতে জমায়েত হলেও খোঁজ পাওয়া গেল না নাহিদ ইসলাম, সার্জিস আলম ও হাসনাত আব্দুল্লাহর। পরে যোগাযোগ করে জানা গেল, ডিজিএফআই তাদের সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে ডেকে সমঝোতার চেষ্টা করছে। ডিজিএফআইয়ের সাথে আলোচনা শেষে তারা চার দফা থিকা এক দফায় চইলা আসে—”সব গ্রেডে, সব ধরনের অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে সংসদে আইন পাস করতে হবে।”

৭ জুলাই (রোববার): বাংলা ব্লকেডে অচল রাজধানী

বেলা আড়াইটা থিকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও বিভাগের স্টুডেন্টরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়া সেন্ট্রাল লাইব্রেরীর সামনে জড়ো হয়। বিকাল সাড়ে তিনটায় মিছিল শুরু হয় এবং চারটার দিকে কয়েক হাজার স্টুডেন্ট শাহবাগ মোড় অবরোধ করে। ঢাকায় মোট আটটা পয়েন্টে অবরোধ হয়—যেমন শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, চানখারপুল, আগারগাঁওসহ বিভিন্ন জায়গায়। একপর্যায়ে স্টুডেন্টরা পুলিশি ব্যারিকেড ভেঙে শাহবাগ ছাড়ায়ে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হয়ে বাংলামোটর পর্যন্ত আগায়ে যায়। ঢাকার বাইরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্টরা ঢাকা-আরিচা হাইওয়ে অবরোধ করে। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, কুমিল্লা, খুলনা, রংপুর, সাভার, সিলেট, গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করে স্টুডেন্টরা। আসিফ মাহমুদ তার বইয়ে লিখছেন, ৭ জুলাই সন্ধ্যায় ব্লকেড শেষে সবাই টিএসসিতে জমায়েত হলেও ডিজিএফআইয়ের পক্ষ থেকে মাঠের আন্দোলনকে আদালতে নিয়ে আন্দোলনের যৌক্তিকতা শেষ করে দিতে চাওয়া হয়। ছাত্রদের আদালতে নিতে ডিজিএফআইরে দায়িত্ব দিছিল ওবায়দুল কাদের।

৮ জুলাই (সোমবার): দ্বিতীয় দিনের ব্লকেড, বিস্তৃত অবরোধ

আসিফ মাহমুদের জবানে জানা যায়, ৮ জুলাই দুপুর ২টায় ডিজিএফআই আবার বসে সমন্বয়কদের সাথে। মিটিংপ্লেস এবার ভিসি অফিসের লাউঞ্জ। ভিসির রুমে ছিল ডিজিএফআই অফিসার কর্নেল তারেক ও সাংবাদিক সমিতির সভাপতি আল সাদী ভুঁইয়া। আর আন্দোলনকারীদের মধ্যে ছিলেন নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ, সার্জিস আলম ও বাকের মজুমদার। ছাত্রদের পক্ষ থিকা রিট করতে সমন্বয়কদের চাপ দেয় কর্নেল তারেক ও আল সাদী ভুঁইয়া। আসিফ মাহমুদের দাবি, ব্লকেড কর্মসূচি বানচাল করতে সমন্বয়কদের কৌশলে বসিয়ে রাখা হয় ওই মিটিংয়ে। কিন্তু কর্মসূচির সময় ঘনায়ে আসলে তারা বাইরায়া আসে। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে শাহবাগে দ্বিতীয় দিনের মতো ব্লকেড চলে। ঢাকার ১১টা জায়গায় অবরোধ হয়, ঢাকার বাইরে ৯টা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করে স্টুডেন্টরা। চট্টগ্রাম-রাজশাহী-ময়মনসিংহে রেলপথ অবরোধ, এবং সাভার, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, কুষ্টিয়া, রংপুর, কুমিল্লায় হাইওয়ে অবরোধ হয়। চট্টগ্রামে পুলিশি বাধায় মিছিলের গন্তব্য পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় স্টুডেন্টরা এবং রাজশাহীতে পথনাটক, কবিতা ও গানের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ হয়।

৯ জুলাই (মঙ্গলবার): গণসংযোগ কর্মসূচি

আসিফ মাহমুদ তার জুলাই বইয়ে লিখছেন, ডিজিএফআইয়ের চতুরতা বুঝতে পেরে সমন্বয়করা আন্দোলনের পক্ষ থিকা রিট না করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা ব্যক্তিগতভাবে আহনাফ সাইদ খান নামের একজনকে দিয়ে রিট করায়, সাথে যুক্ত হয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি আল সাদী ভুঁইয়াও। উদ্দেশ্য, তারা সরকারকে বোঝাতে চায় তারা নেগসিয়েশনেও আছে যাতে সরকার আন্দোলনকারীদের সাথে হার্ডলাইনে না যায়। ৯ জুলাই রিট হওয়ার পর গনমাধ্যম সেটা ভুলভাবে উপস্থাপন করে। তারা দেখাতে চায় কোটা আন্দোলনের নেতারা রিট করেছে এবং পুরো আন্দোলন আদালতে চলে গেছে—যেমনটা ওই মিটিংয়ে ডিজিএফআই চাইছিলো। এই অবস্থায় আসিফ মাহমুদ একটা ভিডিও বার্তা দেয়। এইদিন ব্লকেড কর্মসূচি সাময়িক স্থগিত হয়, তবে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন অব্যাহত থাকে। সমন্বয়করা দেশের বিভিন্ন জায়গার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অনলাইন ও অফলাইনে গণসংযোগ চালায়। বুয়েট স্টুডেন্টরা মানববন্ধন করে, রাজশাহী কলেজের স্টুডেন্টরা কলেজ গেটের সামনে রাস্তা আটকায়ে দেয় এবং চট্টগ্রামের স্টুডেন্টরা ষোলশহর রেললাইনে বসে পড়ে একটা ট্রেন আধা ঘণ্টা স্টেশনে আটকায়ে রাখে। বিকেল সাড়ে ৬টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম ঘোষণা দেয় যে, ১০ জুলাই বুধবার সকাল ১০টা থিকা সন্ধ্যা পর্যন্ত সারা দেশে সড়ক ও রেলপথে সর্বাত্মক ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি চলবে।

১০ জুলাই (বুধবার): সর্বাত্মক অবরোধ ও আপিল বিভাগের আদেশ

সকাল থিকা স্টুডেন্টরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে জড়ো হয়। এরপর তারা শাহবাগে গিয়া সড়ক অবরোধ করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সামনে ব্যারিকেড দিয়া দাঁড়ায়। ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থা থমকে যায় এবং দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ হয়া যায়। দুপুর ১২টার দিকে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষ ও দুই স্টুডেন্টের করা পৃথক আবেদনের শুনানি শেষে আদেশ দেন যেখানে কোটা পদ্ধতি বাতিল-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের ওপর চার সপ্তাহের স্থিতাবস্থা জারি করা হয় এবং পরবর্তী শুনানির জন্য ৭ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়। অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, এই আদেশের ফলে প্র্যাকটিকালি “যেমন ছিল তেমনই থাকবে”—অর্থাৎ কোটা পুনর্বহাল না হয়া বিদ্যমান (কোটামুক্ত) নিয়োগ ব্যবস্থাই বলবৎ থাকবে। সরকার নিয়ন্ত্রিত গনমাধ্যম বললো, রায় বাতিল হয়ে গেছে, তারপরও ছাত্ররা আন্দোলন করে কেন? ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন আন্দোলনকারীদের বলল “আন্দোলনজীবী”। প্রধান বিচারপতি স্টুডেন্টদের আন্দোলন থিকা ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানাইলো। কিন্তু আন্দোলনকারীরা আদতে কোন সমাধান পাইলো না। তাই তারা সংসদে আইন পাস কইرا সব গ্রেডে কোটা সংস্কারের এক দফা দাবিতেই অনড় থাকলো।

১১ জুলাই (বৃহস্পতিবার): বৃষ্টি মাথায় অবরোধ

আষাড়ের তুমুল বৃষ্টি মাথায় নিয়া, পুলিশি বাধা ঠেইলা সাড়ে ৪টায় রাস্তায় নামলো স্টুডেন্টরা, শাহবাগ অবরোধ করলো। ঢাকা কলেজের স্টুডেন্টদের পুলিশ পিছায়ে দিলেও অন্য জায়গাগুলায় অবরোধ চললো যথারীতি। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের সাথে স্টুডেন্টদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হইলো, ছত্রভঙ্গ করতে শটগানের গুলি আর কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হলো, অন্তত ২০ জন আহত হইলো। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও স্টুডেন্টদের ওপর হামলা হইলো, আহত হইলো ১০ জন। এদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কইলো, কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা নাকি সর্বোচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শন করতেছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলল, স্টুডেন্টরা “লিমিট ক্রস” করতেছে। সরকারের ভাষা আরো কঠোর হইতে শুরু করলো।

১২ ও ১৩ জুলাই (শুক্রবার-শনিবার): ছুটির দিনে রাজপথ ও রংপুরের এক ছেলের কথা

সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও থামলো না আন্দোলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ চললো। আসিফ মাহমুদ জানাইতেছেন, সমন্বয়করা প্রস্তুতি নিতে থাকলো পরের সপ্তাহের বড় কর্মসূচির জন্য। ভেতরে ভেতরে সবাই বুঝতেছিলো, সরকার আর নরম সুরে কথা বলবে না। ১৩ জুলাই শনিবারের দিকে আসিফ মাহমুদের জুলাই বইয়ের মাধ্যমে জানা যায়, ছাত্রলীগ মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করে ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইনের ঘোষণা দেয়। তারা স্টুডেন্টদের সাথে আলোচনা করে জানবে স্টুডেন্টরা কি চায়? কিন্তু ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের এই জনতুষ্টি অর্জনের চেষ্টা বিফলে যায়। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের স্টুডেন্ট আবু সাঈদ, রংপুরের সমন্বয়ক, এই দিন ফেসবুকে লিখলো— ন্যায়ের পক্ষে থাইকা মরাটা অন্যায়ের পক্ষে থাইকা শতবছর বাঁচার চেয়ে বেশি সম্মানের।

১৪ জুলাই (রোববার): “রাজাকার” মন্তব্য আর রাতের বিস্ফোরণ

সকাল ১১টায় স্টুডেন্টরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থিকা গণপদযাত্রা কইরা রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের কাছে স্মারকলিপি দিলো। বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি স্টুডেন্টদের প্রতিনিধিদের সাথে দেখা করল না, স্মারকলিপি রিসিভ করল তার সামরিক সচিব। আসিফ মাহমুদ লিখছেন, রাষ্ট্রপতিকে এক দিনের আল্টিমেটাম দেয়ার পাশাপাশি সমন্বয়করা প্ল্যান করলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছড়ায়ে ছিটায়ে হওয়া আন্দোলনরে একই ব্যানারে নিয়ে আসার। এরই মধ্যে গণভবনে চীন সফর নিয়া সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা কোটা প্রসঙ্গে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে পাল্টা প্রশ্ন করল— মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরাও পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা? এই কথাটাই আন্দোলনের মোড় ঘুরায়ে দিলো। সেই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে জাইগা উঠলো ক্ষোভ। মধ্যরাতে ক্যাম্পাসজুড়ে বিক্ষোভ মিছিল, স্লোগান উঠলো— কেউ কেউ তখন স্লোগানে স্বৈরাচার স্বৈরাচারও বলা শুরু করে। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান ছিলো, চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার। স্টুডেন্টদের এমন স্লোগানে অনেক হাসিনা বিরোধী লোকও আহত হয়। তবে ইতিহাসের ওই মোমেন্ট বুঝতে আমরা হয়তো রাজাকারের প্যারালাল হিসাবে ‘এন্টিসেমাইট’ টার্ম নিয়া ভাবতে পারি। গাজার গনহত্যা নিয়া চিন্তিত সবাইকেই জায়োনিস্ট নেতানিয়াহু ‘এন্টিসেমাইট’ বইলা গালি দেয়। একইভাবে হাসিনাও আওয়ামীলীগের স্বার্থবিরোধী সকলকেই রাজাকার ট্যাগ দিতো; এবং বিরোধীদের বয়ান মোকাবেলায় একাত্তর ও মুক্তিযুদ্ধ ডিসকোর্স ইউজ করতো। বিক্ষোভ মিছিল ও রাজাকার স্লোগানের সেই রাতে, সরকার ঢাবি এলাকায় ফোরজি নেটওয়ার্ক বন্ধ করার নির্দেশ দিলো। ছাত্রলীগ শাহবাগে জড়ো হলো। তারা বিভিন্ন হলের মেইন গেট বন্ধ করে দিলো। একই রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাটা পাহাড় সড়কে ছাত্রলীগের হামলায় দুইজন আহত হইলো। টিটকারির ভাষা থিকা প্রতিরোধের নতুন ভাষা জন্ম নিলো সেই রাতে।

১৫ ও ১৬ জুলাই (সোমবার ও মঙ্গলবার): রক্তাক্ত ক্যাম্পাস ও নতুন মোড়

সকাল হইতেই আওয়ামী লীগ ও হাসিনার পান্ডারা স্টুডেন্টদের বিরুদ্ধে “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নষ্ট করার” অভিযোগ তুললো। ওবায়দুল কাদের বলল, আন্দোলন থিকা “আত্মস্বীকৃত রাজাকার” বাইর হইছে, এর জবাব দিতে ছাত্রলীগ প্রস্তুত। বিকালে সেই জবাবই আসলো রক্তের ভাষায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হল, সূর্যসেন হলসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় রড, লাঠি, হকি স্টিক, রামদা নিয়া স্টুডেন্টদের ওপর হামলে পড়লো ছাত্রলীগ। শহীদুল্লাহ হল থিকা ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে পর্যন্ত ইট পাটকেল ছোড়াছুড়ি ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চললো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আসিফ মাহমুদের দেয়া তথ্যমতে, ছাত্রলীগের হাতে সেদিন আহত হয় প্রায় ২০০ স্টুডেন্ট। এই দিনই রংপুরের আবু সাঈদ ফেসবুকে আক্ষেপ কইরা লিখলো, শিক্ষকরা কেন আন্দোলনে নাই। ১৯৬৯ সালের পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্রদের বাঁচাতে শহীদ হওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ডক্টর শামসুজ্জোহার কথা মনে করায়ে দেন আবু সাঈদ। সেইটা স্মরণ কইরা আবু সাঈদ লিখলো, অন্তত একজন শামসুজ্জোহা হয়া মরাটা অনেক বেশি আনন্দের, সম্মানের, গর্বের। এই ছিলো আবু সাঈদের শেষ ফেসবুক পোস্ট। ১৬ জুলাই বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন হয়া ওঠে ফ্যাসিস্ট হাসিনার বেদখলে থাকা রাষ্ট্র উদ্ধারের আন্দোলন। আর হাসিনাও তালবাহানা, ধোঁকাবাজির মিঠা মিঠা কথা ছাইড়া দেখাইতে শুরু করে তার আসল চেহারা। হাসিনার গুলিতে পড়তে থাকে ছাত্র জনতার অগুনতি লাশ। আবু সাঈদের পেতে দেয়া বুক, কারফিউ, ইন্টারনেট শাটডাউন, আর জুলাই গণহত্যার বাকি দিনগুলার কথা জানা যাবে পরের এপিসোডে।

দিন দুনিয়া

Leave a Reply

dinduniya

Share with