বসে আছি! ১৯৮৪ সালের ৬ জুন ঢাকার কিছু ইয়াং পোলাপাইন একটা ব্যান্ড শুরু করে, নাম দেয় ‘ওয়ারফেজ’। কে জানত, ওয়ারফেজ নামের এই ব্যান্ডটাই একদিন বাংলা রকের লিজেন্ডারি ব্যান্ড হয়ে উঠবে? বা তাদের গানই পরের কয়েক দশকে ধ্যান-জ্ঞান হয়ে উঠবে দেশের আপামর রকপ্রেমী ইয়াং পোলাপাইনদের? সম্প্রতি ওয়ারফেজ মিউজিকে তাদের অসামান্য অবদানের জন্য ‘একুশে পদক’ পাইছে। বাংলায় এখন হার্ডরক আর হেভি মেটালের কথা উঠলেই সবার আগে ওয়ারফেজের নামটাই মাথায় আসে। কিন্তু এই যে তাদের চার দশকের পথচলা, সেইটা আসলে কেমন ছিল? চলেন দেখি ওয়ারফেজের শুরুটা।
সময়টা আশির দশক। দেশে তখন জেনারেল এরশাদের নয়া স্বৈরাচার। রক-মেটাল মিউজিক বলতে তখন আয়রন মেইডেন, স্করপিয়ন্স, ডিপ পার্পল কিংবা মেটালিকার কথাই শোনা যায়। সেই সময় ‘ইন ঢাকা’, ‘এইচএস রকস্টার’ কিংবা ‘ওয়ারফেজ’-এর মতো দেশীয় ব্যান্ডগুলার মেম্বাররা একসাথে আড্ডা দিত, গান শুনত; মাঝে মাঝে তারা রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে গান গাইত। শুরুতে তাদের ভোকালে ছিল বাপি, গিটারে মীর ও নাঈমুল, ইব্রাহিম আহমেদ কমল বেস গিটারে এবং হেলাল ড্রামে। এরা বেশিরভাগই একসাথে পড়ত ঢাকার সেন্ট জোসেফ স্কুলে। শুরুতে শুধু বিদেশি ব্যান্ডগুলার ইংরেজি গান কাভার দিত ওয়ারফেজ।
একপর্যায়ে আশির দশকের শেষ দিকে তখনকার জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘ফিডব্যাক’-এর মাকসুদুল হকের নজরে আসে তারা। তিনি তখন ব্যান্ড মেম্বারদের সংগঠন ‘বাম্বা’র সভাপতি। ওয়ারফেজ মেম্বারদের পটেনশিয়াল বুঝতে পাইরা তাদের বাংলা গান গাওয়ার পরামর্শ দেন মাকসুদ। ১৯৯০ সালে বাম্বা এরশাদ শাহীর পতন উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা ভার্সিটির মলচত্বরে একটা কনসার্ট করে। সেখানে প্রথম বাংলায় গান গায় ওয়ারফেজ। এরপরের বছরই তারা বের করে প্রথম অ্যালবাম—’ওয়ারফেজ’। এরপর আর পেছন তাকাতে হয় নাই ব্যান্ডেরে।
নাইনটিজে যখন ব্যান্ড মিউজিক মানেই ছিল কিবোর্ডনির্ভর মেলোডি, ওয়ারফেজ তখন গানে নিয়ে আইছে গিটারের প্রাধান্য। তুখোড় গিটারে কমল আর ড্রামসের জাদুকর টিপুর হাত ধইরা তৈরি হয় এক ইউনিক সাউন্ড। আর বাংলায় হার্ডরক-হেভি মেটাল ধারার গানের জনপ্রিয়তা গড়ে তোলার পুরো ক্রেডিটই দিতে হবে ওয়ারফেজরে। যখন বাংলায় হেভি মেটাল গানের কথা কেউ ভাবতে পারে না, সেইখানে ওয়ারফেজের ডেবিউ হয় পুরো একটা হেভি মেটাল অ্যালবাম দিয়ে। ওয়ারফেজের সেই অ্যালবামে ‘বসে আছি’ কিংবা ‘একটি ছেলে’র মতো গানগুলা বাংলার রকে যেমন এক নতুন রাস্তা তৈরি করে, অডিয়েন্সরাও পায় নতুন একটা সাউন্ড। দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘অববাক ভালোবাসা’র মাধ্যমে ওয়ারফেজের নিজস্বতা আরও পক্ত হয়।
ওয়ারফেজ যে জিনিসটা করছে, তারা হার্ডরক করছে, হেভি মেটাল করছে; এটার সাথে তারা মেলোডি বাদ দিয়া করে নাই। মেলোডি এবং হার্ডরক-হেভি মেটালের যে একটা ব্লেন্ড, এটাই হইতেছে ওদের সাউন্ডের সবচাইতে বড় ঘটনা। এই মেলোডি আর মেটাল রকের ইউনিক ব্লেন্ড ওয়ারফেজরে আজও প্রাসঙ্গিক রাখছে। ওয়ারফেজ টিক তো বটেই, এখনো ওয়ারফেজরে ছাড়া ভালো কোনো কনসেপ্ট ভাবাই যায় না। তো তাদের এই টিকে থাকার পেছনের রহস্যটা কী? এর পেছনে তাদের সেট করা ব্যান্ড কালচার আরেকটা ইউনিক ঘটনা। সাধারণত দেশে দেখা যায়, ব্যান্ডের ভোকাল চইলা গেলে ব্যান্ড ভাইঙ্গা যায়; কিন্তু ওয়ারফেজের নানা ভোকাল আসছে-গেছে, কিন্তু ব্যান্ড রয়ে গেছে! আপনি যদি একটা ব্যান্ডকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চান, ওয়ারফেজ ভোকাল-নির্ভর ব্যান্ড কালচার ভেঙে যে একটা প্রতিষ্ঠান গড়ার পথ দেখাইছে, এটা আমার কাছে মনে হয় বাংলাদেশে ওয়ারফেজই ফার্স্ট করছে।
ভক্তদের মধ্যে সবসময় একটা মধুর ঝগড়া চলে—ওয়ারফেজের সেরা ভোকালিস্ট কে? সঞ্জয়, ভাবন, করিম নাকি বালাম, মিজান নাকি পলাশ? তবে সত্যটা হলো, সকলকেই ভক্তরা দারুণভাবে গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে সঞ্জয়ের সেই পাওয়ারফুল চিৎকার আজও মানুষের কানে বাজে। ওয়ারফেজের লিরিক ফ্যান্টাস্টিক আর বৈচিত্র্যময়। একদিকে যেমন আছে ‘অসামাজিক’ বা ‘মহারাজ’-এর মতো সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী গান, অন্যদিকে আছে ‘অববাক ভালোবাসা’ কিংবা ‘পথ চলা’র মতো কালজয়ী ব্যালান্ড। পাশাপাশি তাদের সিগনেচার গানগুলার টিপিক্যাল ওয়েস্টার্ন রক গানের যে স্ট্রাকচার, তা অনেক সময় ফলো করে। হতাশার মুখ খোলাটা শেষ করে, ইন্ট্রোটা শেষ করে সে শুরু করে দিচ্ছে ফাস্ট—’ভালোবাসা ক্ষত শুকায়নি আজো’, একদম সাথে সাথে পিঠে-পিঠে। ওই মাঝখানে কিন্তু ও কোনো ব্রেক দিচ্ছে না। যখন যে ভোকাল গান গাচ্ছে, গাওয়ার সাথে সাথে লিরিকসের ধরনের সাথে সাথে এক্সপ্রেস করার সাথে সাথে যে মিউজিকটা, ওই মিউজিকটা ওইভাবেই আগাচ্ছে, এমন না যে কোনো প্রিসেট মিউজিক। এখানেই তাদের ইউনিকনেস।
সেই ‘বসে আছি’ থেকে শুরু করে কোক স্টুডিও বাংলার ‘অববাক ভালোবাসা’—নব্বই দশকের শ্রোতা থেইকা আজকের তরুণ প্রজন্ম, সবাই এখনো ওয়ারফেজে ভুলতে পারে না। দীর্ঘ চার দশকের এই পথচলার স্বীকৃতি হিসেবে একুশে পদক পাওয়াটা বাংলা ব্যান্ড মিউজিকের জন্য এক বড় জয়। স্যালুট ওয়ারফেজ, স্যালুট লিজেন্ড!
Leave a Reply