View: 8

বাপের খোয়াব কতটা পুরাইল হাসিনা?

রাজনীতির নামে অন্যায়, গুম-খুন ও জনগণের জবরদখল কখনো স্থায়িত্ব পায় না; তাই পিতার একক ক্ষমতার স্বপ্ন এবং কন্যার লৌহমানবীর অহংকার শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে পলায়নের চূড়ান্ত ব্যর্থতা ও চরম গণধিক্কারে...
পলিটিক্স

বাপের খোয়াব কতটা পুরাইল হাসিনা? 

 

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাকশাল কায়েম করে শেখ মুজিব। এর ৭-৮ মাসের মাথায় শেখ মুজিব খুন হয়। বাকশালে একটা মাত্র দল, শেখ মুজিব আজীবন প্রেসিডেন্ট। এখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সিভিল সার্ভেন্ট, বুদ্ধিজীবি, শিক্ষক, আর্ট কালচারের লোকজন জয়েন করেন। 

 

শেখ মুজিব মরলেও মরে নাই তার খোয়াব। 

 

২০০৮ সালের ইলেকশনের ভিতর দিয়া সরকার গঠন করে শেখ হাসিনার দল। ৫ বছর পরে ২০১৪ সালে এক তরফা ইলেকশনের ভিতর দিয়া শেখ হাসিনা তার বাপের খোয়াব বা বাকশাল নামের ২য় বিপ্লবের বাস্তবায়ন শুরু করে, বেনামে। দলিলপত্রে বাকশালের মত, একটি মাত্র দল রাইখা বাকিগুলারে ব্যান না করলেও দেশে বিরোধী দল বইলা কার্যত কিছু ছিল না। একতরফা ইলেকশনের কারণে দেশের ক্ষমতার রদবদলে নাগরিকদের ভোটের কোন ভূমিকা অবশিষ্ট রাখে নাই হাসিনা। এটা যে বেনামি বাকশাল সেটা তখন পরিষ্কার হয়, যখন দেশের পাবলিক-প্রাইভেট সেক্টরের নানা কিসিমের পেশা ও অর্গানাইজেশনের লোকজন শেখ হাসিনারে সমর্থন দেয়। বিশেষ করে পাবলিক সার্ভেন্টরা খোলাখুলি ভাবে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ইত্যাদির পক্ষে কথাবার্তা বলা শুরু করে। সবগুলা মিডিয়াই ছোটখাটো দুর্নীতির কথা কইলেও শেখ হাসিনার বৈধতা নিয়া কোন প্রশ্ন উত্থাপিত হয় নাই, বরং তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে সম্বোধন করতে থাকে। জন্মদিন পালন করতে থাকে, দ্বিতীয় বিপ্লব বা বেনামী বাকশালকে নতুন টার্ম দিয়া বোঝানো শুরু হয়—বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা। পাশাপাশি বেনামী বাকশালরে ২য় বিপ্লব, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন নাম দিয়া সমাজে নানা বই, কলাম, ডিসকোর্স রচনা করে শেখ মুজিবের ভক্ত মুরিদরা। 

 

তার অনুগ্রাহীদের কাছে শেখ হাসিনা ঝানু রাজনীতিবিদ হিসাবে পরিচিত হয়, তারিফ পায়। এবং শেখ মুজিবের মতো সহজে বিশ্বাস করার দুর্বলতা মুক্ত সত্যিকারের লৌহ মানবি হিসাবে তাদের পরম আনুগত্য লাভ করে। এবং তারা নিশ্চিত হইয়া এই বয়ান প্রতিষ্ঠা করে—শেখ হাসিনার বিকল্প নাই। 

 

২০১৮ এবং ২০২৪ সালের ইলেকশনের টাইমে মৃদু টেনশন দেখা যায় এই নয়া বাকশালীদের ভেতর। ২০২৪ সালে জানুয়ারির নির্বাচনের পরে তারা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। শেখ হাসিনার আমরণ ক্ষমতার ব্যাপারে তাদের মনে সকল অনিশ্চয়তার মেঘ দূর হইয়া যায়। 

 

তো ঝানু রাজনীতিবিদ হিসাবে কী কী হাসিল করল এবং করবে বইলা তারা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার উপর ভরসা রাখছিল? 

 

  • “সফলভাবে ইসলামি জঙ্গিবাদ নির্মূল করবে”
  • “সাম্প্রদায়িকতার মূল উপড়ে ফেলবে”
  • “জামাত নির্মূল করবে। অলরেডি যুদ্ধপরাধীদের শায়েস্তা করছে।
  • “মুক্তিযুদ্ধে চেতনায় বলিয়ান এক নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলবে”
  • “উন্নয়নের জোয়ারে জনগণের সকল ক্ষোভ ভাসায়ে দেবে।” 
  • “একমাত্র শেখ হাসিনাই মাল্টিপোলার দুনিয়ায় ব্যালেন্স রক্ষা করতে পারবে” 
  • “দেশের মানুষের মনে বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং শেখ মুজিবের নাম সোনার হরফে খোদাই হইয়া যাবে।” 
  • এবং “দেশের লিবারেল-সেক্যুলার ব্লকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শেখ হাসিনার বিকল্প নাই।”  

তাদের জন্য বাংলাদেশকে নিরাপদ চারণভূমি বানাইছেন শেখ হাসিনা। এবং সেটা এতই স্থায়ী যে চিন্তিত হওয়ার কিছু নাই আর। আর ওদিকে শেখ হাসিনা ২০৪১ সাল পর্যন্ত কী কী করবে সেটার পরিকল্পনা রচনা করছে। 

 

কিন্তু আরেক আগস্টে, ২০২৪ সালে, লোহমানবী শেখ হাসিনা নিজের ভগ্নি এবং কতিপয় সুটকেস সমভিব্যাহারে, একটি লৌহযানে ছড়িয়া দিল্লি পলায়ন করিলেন। নিজের পলায়নের দুয়েকদিন আগে নিকটাত্মীয়দের ঝাড়ে বংশে সোনার বাংলা ছাড়িয়া পলায়নের নির্দেশনা দিলেন। 

 

গায়ের জোরে দখল করা গণভবন সেই গায়ের জোরেই ফেরত নিল জনতা। বাঁচাইতে পারে নাই তার সাঙ্গপাঙ্গ-গুণ্ডাপাণ্ডা, আর্মি, পুলিশ, বিজিবি—সবাই মিলাও। পালাবার আগে নিজেরে ছিনায়ে গেল ইতিহাসে নিষ্ঠুরতম খুনি হিসাবে। পালানোর সেই মহাযজ্ঞে ছিল মন্ত্রী মিনিস্টার, এমপি থেইকা শুরু করে এলাকার পাতি নেতাকর্মী—এন্টায়ার পার্টি। বাকিরা খুনের মামলায় জেলে, কেউ কেউ বহু বছরের ডাকাতির পয়সায় বাচাইতে চেষ্টা করল নিজেদের গর্দান।   

 

যেই লিবারেল সেক্যুলার ব্লক সেই ঝানু পলিটিশিয়ানের আচলের নিচে নিরাপদে গুনগুনাইতেছিল তারা নিজেদের বেশুমার ডাকাতির পয়সা দিয়াও নিজেরে রক্ষা করতে পারে নাই। সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ নির্মূলের বাসনা ভাঙা মাজারে চিতপটাং হইয়া পইড়া থাকল। তাহাদের মুজিব চেতনা হুড়মুড় কইরা ভাইঙা পড়ল বত্রিশ নাম্বার এবং সারাদেশে। যেই জামাত নির্মূলের বাসনা ছিল শেখ হাসিনার ভক্ত মুরিদদের, সেই জামাতই এখন ইতিহাসের সফলতম নির্বাচনের পরে পার্লামেন্টের এক নাম্বার বিরোধি দল। সেই জামাত এখন দাওয়াত পায়, নিরাপত্তা খয়রাত দেয় শেখ হাসিনার গড চাইল্ড মিডিয়া হাউজে। আর দেশে আটকে পড়া আওয়ামী নেতাকর্মীরা ঢুকে পড়ছে জামাতের ছায়াতলে। হাসিনাপ্রেমীদের টার্ম ছিল বিএনপি-জামাত, যেখানে খালেদা জিয়া হইল জামাতের বিএনপি শাখার আমির। আর এখন নাকে খত দিয়া বিএনপিরেই একমাত্র গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল মানতে হইতেছে তাদের।  

 

বহু ফেনায় ফেনায়িত উন্নয়নের বয়ান ইলেকশনের প্রতি দেশের মানুষের পিরিতি ভাসায়ে নিতে পারে নাই। তাহলে ইতিহাস কী রায় দেবে? শেখা হাসিনা কতটা ধুরন্দর পলিটিশিয়ান? বাপের খোয়াব মোতাবেক নিজেরই বানায় নেয়া প্রজেক্ট কতটা বাস্তবায়ন করতে পারল বাপের দুর্বলতা উতরাইয়া ওঠা মাইয়া? বিবেক বিসর্জন দিয়া, হাজারো গুম-খুনের আয়নাঘরে বিচলিত না হওয়া লৌহ মানবী শেখ হাসিনা এবং তার অনুচরদের, কতটা কামিয়াব বলবে ইতিহাস? 

দিন দুনিয়া

Leave a Reply

dinduniya

Share with