১২৫৮ সালে লোহিত সাগরের কাছে হুমাইছাড়া নামের এক উপত্যাকায় থামছিল তার কাফেলা। বলা হয় জীবনের শেষ হজের আগেই তিনি বুঝছিলেন এই পথেই তার সফর শেষ হইতে যাইতেছে। মৃত্যুর আগে তিনি সাথীদের ডাইকা কিছু ওসিহত কইরা গেলেন। সেই মরুভূমিতেই তাকে দাফন করা হইছিল। আজও হুমাইসেরায় তার মাজারে হাজারো মানুষ জিয়ারতে যায়। প্রশ্ন হইলো, মরক্কোর এক পাহাড়ি গ্রামের এই মানুষ শেষ পর্যন্ত মিশরের এই মরুভূমিতে আইলেন কিভাবে?

তার নাম আবুল হাসান আলী আল সাদলী। জন্ম ১২ শতকের শেষ দিকে, মাগরিবের ঘুমারা অঞ্চলে। তরুণ আবুল হাসানের মাথায় তখন কোন নতুন তরিকা বানানোর চিন্তা ছিল না। তার মাথায় ছিল একটা মাত্র প্রশ্ন, কে এই যুগের কুতুব? সুফি পরিভাষায় কুতুব হইলো এমন একজন মানুষ যিনি সেই সময়ের আধ্যাত্মিক মেরুদন্ড। আবুল হাসান ঠিক করলেন তাকে খুইজা বাইর করতেই হবে। খোজ শুরু হইল মাগরিবে। পথ তাকে নিয়ে গেল আরোপুবে বাগদাদ পর্যন্ত। বাগদাদে সুফি সায়ক আবু ফাতাহ আল ওয়াসিতির কাছে গিয়ে বললেন যে তিনি যুগের কুতুবকে খুঁজতেছেন।

ওয়াসিতি তখন হাইসা দিয়ে বললেন, তুমি যারে খুঁজতেছো তারে তো মাগরিবেই রাইখা আসছো, ফিরা যাও। হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে আবুল হাসান বুঝলেন, যেই উত্তর খুঁজতে তিনি পুবে আসছেন সেই উত্তর অপেক্ষা করতেছে তার নিজের দেশেই, মরক্কর রিপ পাহাড়ের জাবালাল আলমে। আবুল হাসান ভাবছিলেন যিনি যুগের কুতুব তিনি হাজার হাজার মুরিদে ঘেরা কোন এক বুজুর্গ হইবেন। কিন্তু সেই পাহাড়ে গিয়া তিনি দেখলেন পুরাই উল্টা দৃশ্য। এক অতি সাধারণ বৃদ্ধ নিজের কাজ নিজেই করতেছেন, নিজের হাতে কাপড় ধুইতেছেন। কোন দরবার নাই, বিশাল মজলিস নাই। ইনি আব্দুস সালাম ইবনে মাশিষ, সেই যুগের কুতুব। তার মুখে সালাতুল মাশিশিয়া যতবার উচ্চারণ হইতেছিল ততবার জাবাল আল আলম কাইপা উঠতেছিল।

প্রথম সাক্ষাতেই ইবনে মাশিষ তাকে গোসল কইরা আসতে বললেন। এই গোসলটা শুধু শরীর পাক পবিত্র কইরা আসার জন্য বলা হয় নাই, বরং ইগোর অহংকার আর পুরানো ধারণাগুলা পিছনে ফালায়ে মুর্শিদের সামনে নতুন করে দাঁড়ানোর প্রতীক ছিল এটা। এরপর শুরু হইলো তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বেশিদিন ইবনে মাসিশ এই দুনিয়ায় রইলেন না। যে পাহাড়ে তিনি আবুল হাসানকে শিক্ষা দিছিলেন সেইখানেই এক বিদ্রোহী দলের হাতে নিহত হন। মুর্শিদ আর দুনিয়াতে রইলেন না, কিন্তু তার শিক্ষা তখন পাহাড় ছাইড়া বাইর হইয়া পড়ছে তার মুরিদের সাথে। વિદায়ের আগে ইবনে মাশিষ আবুল হাসানকে পাঠাইছিলেন বর্তমান তিউনিশিয়ার ইফ্রিকিয়া অঞ্চলের দিকে। আর সেই যাত্রা থেকেই জন্ম নেয় সাদিলিয়া তরিকা। তিউনিশিয়ার সাদিলা পাহাড়ে বইসা দীর্ঘ সময় নির্জনে মোরাকাবা আর সাধনায় কাটাইলেন আবুল হাসান। এই পাহাড়ের নামটাই পরে তার নামের সাথে জুড়ে গেল, আল সাদিলী।

সাদিলা পাহাড় ছাইড়া এইবার তিনি নামলেন তিউনিস শহরে। এইখানেই তার চারপাশে গইরা উঠতে শুরু করল প্রথম মুরিদ গোষ্ঠী। জিকির, খিদমত আর শিক্ষাদানের একটা ধারা তৈরি হইল। মুরিদদের সংখ্যা বাড়তেছিল, প্রভাবও বাড়তেছিল। কিন্তু এই জনপ্রিয়তাই কিছুদিন পর তার জন্য বিপদ হইয়া দাঁড়াইল। রাজনৈতিকভাবে অস্থির তিউনিসে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলো, তিনি নাকি গোপনে নিজেকে মাহাদী দাবি করতেছেন। স্থানীয় কাজের অভিযোগে তাকে শাসকের সামনে হাজিরও হইতে হইল। অভিযোগ টিকলো না, কিন্তু তিউনিশে থাকা তার জন্য ধীরে ধীরে কঠিন হইয়া গেল।

আবুল হাসান আবারও ঘর ছাড়লেন। এবারের গন্তব্য মিশর। ১২৪০ এর দশকে তিনি আলেকজান্ড্রিয়ায় থিতু হইলেন। এইখানেই সংসার করলেন, সন্তান হইল, মুরিদ বাড়লো। আর এইখানেই সাদিলিয়ার মূল চরিত্র পরিষ্কার হইল। আল্লাহকে পাওয়া মানে সমাজ ছাইড়া পালানো না। আলেকজান্ড্রিয়াতেই আল সাদিলির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুরিদ আর খলিফাতের একজন হইলেন আবুল আব্বাস আল মুরসি। শায়খ সাদিলী থেকে শায়ক মুরসি, আর শায়ক মুরসি থেকে শায়ক ইবনে আতাইল্লা। এই তিন প্রজন্মের হাতে তরিকার মূল কাঠামোটা পুক্ত হইল। সায়কাল সাদিলী পথটা দেখাইলেন, আর মুরসি সেই পথ আগায়ে নিয়ে গেলেন, আর ইবনে আতাইল্লা পরে সেই অভিজ্ঞতার একটা বড় অংশকে ভাষা আর লেখার মধ্যে ধরলেন। এই তিনজনের পরেই সাদিলিয়া তরিকা আর একটা শহরের ছোট মজলিস থাকলো না, শুরু হইলো তার বিস্তার।

সাদিলিয়া তরিকার একটা গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হইল সাহ। সহজ ভাষায় ভেতরে আল্লাহর প্রেম যত গভীরই হোক বাইরে মানুষকে খুশি থাকতে হবে। পরিবার আছে দায়িত্ব নিতে হবে, ব্যবসা আছে সৎভাবে করতে হবে, সমাজ আছে তার মাঝেই থাকতে হবে। ভেতরে খোদার প্রেমে মাতাল বাইরে পুরাই সোবার। তাই সাদিলিয়া তরিকা মুরিদকে আলাদা কইরা চেনার মত কোন পোশাক বাইধা দিল না। আলখাল্লা পড়তেই হবে, বিশেষ টুপি লাগবেই এমন কিছুই না। বরং সায়কাল সাদিলী তার মুরিদদের জীবিকা অর্জন আর সামাজিক দায়িত্বের উপর জোর দিতেন। কেউ ব্যবসায়ী, কেউ কারিগর, কেউ শিক্ষক, বাইরে আর ১০ জন মানুষের মতোই। পার্থক্যটা পোশাকে না বরং চরিত্র আর কলবে।

সাদিলিয়া তরিকায় নফস ধাপে ধাপে পরিষ্কার হয়। এই সাতটা ধাপকে বলা হয় আতওয়ারুস সাবা, অর্থাৎ নফসের সাত পর্যায়। প্রথমটা নফসে আম্মারা, যেখানে রাগ, লোভ ও নিচু প্রবৃত্তি মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে। দ্বিতীয়টা নফসে লাওয়ামা, ভুলের পর অনুতাবাসে এই পর্যায়ে। তৃতীয় নফসে মুলহামা, ভালো কাজের দিকে টান তৈরি হয় যদিও আত্মকেন্দ্রিকতা তখনো থাকে। চতুর্থ নফসে মুতমাইন্না, আল্লাহর স্মরণে অন্তর শান্ত ও স্থির হয়। পঞ্চম নফসে রাদিয়া, বান্দা আল্লাহর সিদ্ধান্ত ও তকদীরের উপর সন্তুষ্ট হইতে শেখে। ষষ্ঠ নফসে মারদিয়া, মানুষ এমন চরিত্র গইরা তোলে যাতে সে আল্লাহর সন্তুষ্টির যোগ্য হইতে পারে। সপ্তম নফসে কামিলা, পরিপূরক নফস, যেখানে আচরণ, বিবেক, জ্ঞান আর কাজের মধ্যে গভীর ভারসাম্য তৈরি হয় এই পর্যায়ে।

সাদিলিয়া তরিকার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হইল খুলুয়া বা খালুয়াত। মুরিদের নফসের উন্নতির জন্য কোন একটা নির্জন কক্ষে মোরাকাবায় বসানো হয়। খালুয়াতিয়া ধারায় নফসের উন্নতির জন্য নফসের সাত ধাপের সঙ্গে সাতটি নামের জিকরও যুক্ত করা হয়— লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহ, হু, হক, হাই, কাইয়ুম ও কাহার। তবে সব খালুয়াতি শাখায় এই পদ্ধতি সেইম না। সাদিলী অনেক শাখায় এই তরিকা থেকে ফুলুয়া বা খালুওয়াত এডপ্ট করছে, উল্টাটা করছে খালুওয়াতিরা, সাদিলীদের জিকির এডপ্ট করার মাধ্যমে।

এই তরিকার সবচেয়ে পরিচিত দোয়াগুলোর একটা হলো হিজবুল বাহার অর্থাৎ সমুদ্রের লিতানি। সায়ক সাদিলী নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম এর কাছ থেকে এক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এই দোয়া লাভ করেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধইরা নাবিক, মুসাফির আর হজযাত্রীদের মাঝে আজও এই দোয়া জনপ্রিয়। সাদিলিয়ার আরেকটা বৈশিষ্ট্য হইল এদের জিকির শুধু মজলিসের ঘটনা না, নিঃশব্দে কাজ করতে করতে হাঁটতে হাঁটতেও আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। তবে এর মানে এই না যে সব সাদিলী জিকির নীরবেই হয়। এই তরিকার বিভিন্ন শাখায় সমবিত জিকির, হাদ্রা আর আহজাব পাঠ সবই দেখা যায়। জিকিরের পাশাপাশি আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ চর্চা হইলো মুদাকারা, দ্বীন, আখলাক আর আধ্যাত্মিক জীবন নিয়ে নিয়মিত আলোচনা।

সাদিলী তরিকার অনেক শাখায় জিয়ারত একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুধু কবর জিয়ারত না, কোন বুজুর্গ যেখানে বইসা ইবাদত করছেন সেই জায়গাকেও আল্লাহ বরকতময় কইরা রাখেন বইলা মানেন তারা। তিউনিসের জাল্লাস কবরস্থানে অবস্থিত বেল হাসেন জাউয়ার গুহা এরকম একটা উদাহরণ। আল সাদিলির কবর সেইখানে নাই কিন্তু এই গুহায় তিনি একসময় মুরাকাবা করতেন, জায়গাটার মধ্যে তার বরকত জড়াইয়া আছে, হাজারো মানুষ আজও সেইখানে হাজির হন জিয়ারতের জন্য।

সায়কাল সাদিলীর নীতি দুনিয়ার মধ্যে থাকা শুধু বাজার আর পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরেও ১২৫০ সালে তিনি তার মুরিদদের সাথে মানসুরার যুদ্ধ করছেন। এই যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে ফরাসি রাজা নবম লুই এর সপ্তম ক্রুসেডকে থামায়ে দেয়া হয়। সাদিলী তরিকায় আল্লাহর জ্ঞান লাভ আর সমাজের সংকট মোকাবেলা এই দুইটা কখনোই আলাদা জিনিস ছিল না। এই তরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখা গেল সমাজেই। সাদিলী মুর্শিদ আর মুরিদরা ছড়ায়ে পড়লেন বাজারে, বন্দরে, আদালতে। বন্দরগুলাতে তারা হইয়া উঠলেন ব্যবসায়ীদের শিক্ষক, আর জাউয়াগুলা হইয়া উঠলো মুসাফিরদের অতিথিশালা, গরীবের আশ্রয়, বিরোধ মেটানের জায়গা। যেইখানে রাষ্ট্রের হাত পৌঁছাইতো না সেইখানে পৌঁছাইতো এই তরিকা।

পরের শতাব্দীতে সাথিলিয়া তরিকা থেকে একের পর এক শাখা বাইর হইতে থাকে। মরক্কোয় জাজুলিয়া আর নাসিরিয়া, পরে দারকাউইয়া, মিশর আর হেজাজের দিকেও তৈরি হয় আলাদা আলাদা ধারা। নাম বদলাইছে, অঞ্চল বদলাইছে, চর্চার ধরণও কিছুটা বদলাইছে, কিন্তু মূল সুরটা একই রইয়া গেছে। সাদিলী তরিকার সায়ক আল বুসরি লিখছিলেন কাসিদা আল বুরদা, পশ্চিম আফ্রিকা থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত আজও মুখস্ত আর পাঠ করা হয় এই কাব্য। অন্যদিকে সায়ক আল জাজুলি রচনা করেছিলেন দালাইল আল খায়রাত, আর সায়ক ইবনে আতাইল্লাহ রচনা করেছিলেন আল হিকাম, সাত শতাব্দী ধইরা যার ব্যাখ্যা রচনা করা হইতেছে।

ইবনে আতাইল্লাহ ছিলেন একজন মালিকী ফকি। প্রথম জীবনে তিনি সুফিদের পছন্দ করতেন না। একদিন তিনি আসছিলেন সায়ক মুরসির সাথে তর্ক করতে, সুফিদের বিরুদ্ধে তার ব্যাপক আপত্তি ছিল। কিন্তু আল মুরসির কথা শোনা মাত্র সেই আপত্তি গইলা গেল। ১২ বছর তিনি কাটাইলেন সায়কের সান্নিধ্যে। দিনের বেলা কায়রতে ফিক পড়াইতেন আর কাজের শেষে কলবে নিতেন এক ভিন্ন জ্ঞান। আল মুরসির দুনিয়া ত্যাগের পর তিনিই হইলেন তরিকার মুর্শিদ, আর তার কলম থেকেই বাইর হইল আল হিকাম কিতাব।

১৬০৩ সালে সুলতানের মৃত্যুর পর মরক্কোর কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ভাইঙ্গা পড়তে শুরু করে। তখন অনেক জায়গায় সমাজের শৃঙ্খলা ধইরা রাখার দায়িত্ব নিল জাউয়াগুলা। তারা মানুষের নিরাপত্তা, বাণিজ্য এমনকি কোন কোন শহরের ম্যানেজমেন্টও সামলাইতে শুরু করল। একসময় তাদের ক্ষমতা বাড়ার ফলে নতুন আলাউই শাসকদের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে যাইতে হইল। আলাউইরা জিতল, অনেক জাইয়া ভাইঙ্গা দিল। দক্ষিণে কিছু সুফি নেটওয়ার্ক টিকে গেল বাণিজ্য পথ পাহারা দিয়া বই আর পান্ডুলিপি ছড়াইয়া, আর মরক্কোর এক অঞ্চলরে আরেক অঞ্চলের সঙ্গে জোড়া লাগাইয়া।

১৮ শতকে আসলো এই তরিকার আরেকটা শক্তিশালী শাখা দারকাউইয়া। মাওলায়ে আল আরাবি আল দারকাউই ছিলেন এর শায়ক। জিকির, সুন্নাহ পালন, ত্যাগ আর দরবারী বিলাসিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল তাদের মূল মন্ত্র। দরবারী এলিটদের বিরোধিতা করায় ওই সময় মরক্কের সুলতান তাকে কারাগারে পাঠাইছিলেন। আরো পরে জন্ম নিল আলজেরিয়ার আলাউইয়া। আহমেদ আল আলাউইর হাত ধইরা শামের জমিনে দাঁড়াইলো ইয়াস্রুত ওয়াইয়া, আধুনিক মরক্কোর সবচেয়ে বড় শাখা বুশতিয়া আর ঐতিহ্যবাহী হাবিবিয়া শাখা।

১৯ শতকের শুরুতে দারকাউই তরিকার নেতৃত্বে বর্তমান শাসনের বিরুদ্ধে একের পর এক বিদ্রোহ দানাবাদে। ১৭৮৩ থেকে ১৮০৫ সাল পর্যন্ত পশ্চিমে আব্দুল কাদির ইবনুশ শারীফ আর পূর্বে ইবনুল আহরাশের নেতৃত্বে দারকাউইরা বড় বড় শহর দখল করে নেয়। এই প্রতিরোধের আগুন ছড়ায়ে পড়ে আরো দূরে। মক্কায় আহমদ ইবনে ইদ্রিস একাধিক তরিকার জ্ঞান একসাথে পড়লেন। তার শিষ্য মোহাম্মদ ইবনে আলী আস সানুসি ফেজে সাদিললি নাসিরী শাখাসহ বিভিন্ন তরিকার অভিজ্ঞতা নিয়া গইরা তোলেন সানুসিয়া তরিকা। লিবিয়ার সিরেনাইকা এলাকায় এই তরিকা গোত্রে গোত্রে ফ্রি শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে। ২০ শতকে ইতালিয় কলোনাইজারদের বিরুদ্ধে দশকের পর দশক লড়াই করে সানুসিয়ার মুর্শিদ ও মুরিদেরা। এই লড়াই থেকেই বের হয়ে আসেন ওমর আল মুক্তারের মত নেতা, যিনি মরুভূমির সিংহ নামে পরিচিত ছিলেন। সাদিলিয়ার মূলধারা কখনোই নিজেরা দরবারী শক্তি হইতে চায় নাই, কিন্তু এই তরিকার শাখাগুলা বারবার ইতিহাসের নানা পর্যায়ে পরিণত হইছে প্রতিরোধের প্রধান শক্তিতে।

অন্য তরিকার সাথে তুলনা করলে সাদিলিয়ার ইউনিকনেসটা আরো পরিষ্কার হয়। কাদিলিয়ার শুরুটা হয়েছিল মরুভূমিতে আর সাদিলিয়ার নির্জন পাহাড়ে। কাদিলিয়া ছড়াইছে বাগদাদ থেকে পশ্চিম আফ্রিকা পর্যন্ত, সাদিলিয়া ছড়াইছে উত্তর আর মধ্য আফ্রিকায়। সাদিলিয়ার তুলনায় কাদেরিয়ার অনেক শাখায় একসঙ্গে জিকির করার চল বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে সাদিলিয়ায় লোক দেখানোর চেয়ে কলবের ভেতরে জিকির, নিয়মিত অজিফা আর মুরাকাবার উপর বেশি জোর দেওয়া হয়। সাদিলিয়ার কিছু শাখাতে জোরে জিকির ও হাদরার চলও আছে।

নকশবন্দীয়ার সাথেও মিল আছে নীরব জিকিরে, কিন্তু তাদের সায়করা ঐতিহাসিকভাবে সুলতান সম্রাটদের পরামর্শ দিতেন, দরবারের ভেতরে থেকে প্রভাব বিস্তার করতেন। সাদিলিয়া এমন রাজনৈতিক পাওয়ার নিজেরা গইরা তোলে নাই, তাদের মতে শাসকের চেঞ্জ শুরু হয় নিজের চেঞ্জ থেকা। দক্ষিণ এশিয়ার চিশতিয়া যাদের কলবে সামা, কাওয়ালি আর ভালোবাসা, সাদিলিয়ারা সাধারণ সংগীতের চেয়ে নীরব জিকির, শরীয়ত মাইনা চলা আর কলবের স্থিরতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। চিশতিয়া মুর্শিদরা সুলতানের দরবারে যাইতেন না, জায়গীর নিতেন না, থাকতেন দরিদ্রের পাশে লঙ্গর চালাইতেন। সাদিলিয়া সেই পথ নেয় নাই। তারা রাজদরবার থেকে দূরে থাকছে, গরীবের খেদমত করছেন কিন্তু রাজপথও ছাড়েন নাই। ব্যবসা, বাণিজ্য আর ডেইলি লাইফের মধ্যেই তারা চালায়ে গেছেন তাদের চর্চা।

মেলেবিরা হযরত জালালউদ্দিন রুমির চিন্তা ও শিক্ষাকে নিয়ে গইড়া ওঠা একটা তরিকা। এই তরিকার সবচেয়ে পরিচিত আচার হইলো সেমা। এইখানে সংগীত, বাঁশির সুর, কবিতা এবং ঘূর্ণন নৃত্যের মাধ্যমে রুহুকে আল্লাহর কাছে নিয়ে যাওয়ার চর্চা করা হয়। অন্যদিকে সাদিলিয়া তরিকার মূলমাত্র সাহ, ভেতরে আল্লাহও প্রেমে মাতাল আর বাইরে পুরাই সজাগ। সাদিলিয়াতে নাচ বা সংগীতকে তরিকার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয় না, বরং দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে আল্লাহকে স্মরণ করা, নিজের চরিত্র ও নফসকে পরিষ্কার করা এবং কলবের ভারসাম্য বজায় রাখাই এর মূল লক্ষ্য।

আজকের দুনিয়ায় সাদিলিয়ার প্রায় ৭২ টা শাখা আছে। ২০ শতকের গোড়ার দিকে সুইডিশ চিত্রশিল্পী ও সুফি স্কলার ইভান আগেলি পশ্চিম ইউরোপের সাদিলিয়া তরিকার প্রথম আনুষ্ঠানিক রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে হাজির হন। তার হাত ধইরাই সাদিলিয়া তরিকায় আসেন বিখ্যাত লেখক রন এগেনো। পরে উনি ট্রেডিশন আর মডার্নিটি লিখছিলেন অনেকগুলা প্রভাবশালী বই, যেইখান থেকে বাইর হয়ে আসে পেরেনিয়াল ফিলোসফি স্কুলের চিন্তাধারা। এইভাবেই মরক্কোর এক তরুণের পাহাড়ে বইসা করা মোরাকাবা আজ পৌঁছায়া গেছে ইউরোপ আমেরিকার সব বড় বড় শহরে।

সাদিলিয়া তরিকার মুরিদেরা কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ ডাক্তার, কেউ শিক্ষক আর কেউ বা ব্যবসায়ী। এক নজরে দেইখা বোঝার উপায় নাই যে কে মুরিদ, কে মুরিদ না। অফিসের ফাঁকে বা বাজারের দোকানে দুই মিনিটের নীরব জিকির, তারপর আবার কাজে ফেরত যাওয়া, এইটাই ৮০০ বছর আগের সেই শিক্ষার আধুনিক রূপ। ইন্টারনেট আর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সাদিলিয়ার আহযাব আর হিকামের পাঠ এখন পৌঁছায়া যাইতেছে অ্যাপ আর অনলাইন মজলিসের মধ্য দিয়া। মাধ্যম বদলাইছে কিন্তু মূলে সেই একই কথা— দুনিয়া থেকে সইরা না গিয়া দুনিয়ার ভেতরেই আল্লাহকে খোঁজা।

দুনিয়াদারি ছাইড়া না দিয়া বরং দুনিয়ার মধ্যে থাইকাই আল্লাহকে খোঁজার অর্থ আসলে কি, ইবনে আতাইল্লা এই প্রশ্নের উত্তর দিছিলেন সাত শতাব্দী আগে। আল্লাহ যখন তোমাকে দুনিয়ার কাজকর্মের মধ্যে রাখছেন তখন সব ছাইড়া দিয়া একা হইয়া যাওয়ার যে ইচ্ছা, সেইটা আসলে তোমার নফসের একটা লুকানো খায়েশ। আর আল্লাহ যখন তোমাকে দুনিয়ার ঝামেলা থেকে মুক্ত কইরা একান্তে রাখছেন, তখন আবার সেই দুনিয়াদারির মধ্যে জড়ানোর যে ইচ্ছা, সেইটা হইলো তোমার হাই স্পিরিচুয়াল এইম থেকে নিচে নাইমা আসা।

ছাপাখানা মুসলিম দুনিয়ায় আসার আগে চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধইরা দালাইল আল খাইরাত হাতে কপি হইয়া ছড়াইতো মুসলিম দুনিয়াতে। নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম ও আগাখান মিউজিয়াম সহ অনেক গবেষক বলছেন কোরআনের পর মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বেশি হাতে লেখা কপি হওয়া কিতাব এটা। মরক্কো থেকে ইন্দোনেশিয়ায় এই বইয়ের আছে অগণিত কপি।

এত মানুষের হাতে যে বইটা শতাব্দীর পর শতাব্দী ঘুরতেছে, সেই দালাইল আল খাইরাত লেখার পেছনেই একটা গল্প আছে। ১৫ শতকে ইমাম আল জাজুলি একবার দীর্ঘ সফরে বাইর হন। একদিন নামাজের সময়ে তার অযু করার দরকার পড়ল কিন্তু আশেপাশে কোথাও পানি নাই। খুঁজতে খুঁজতে তিনি এক কুয়ার সামনে আইসা দাঁড়াইলেন। কুয়ায় পানি আছে কিন্তু অনেক নিচে, তোলার মত কোন বালতি বা দড়ি নাই কোথাও। সায়ক জাজুলি দাঁড়ায় রইলেন কুয়ার পাশে, পানি চোখের সামনে কিন্তু ধরার উপায় নাই।

এমন সময় একটা ছোট্ট মেয়ে তারে দেইখা আগায় আসলো। মেয়েটা সায়কের পরিচয় চাইলে তিনি নিজের পরিচয় দিলেন। মেয়েটা তার নাম জানতো, লোকজন যে তার জ্ঞান আর ঈমানদারীর প্রশংসা করে সেটাও জানত। অবাক হইয়া মেয়েটা জিজ্ঞেস করল, এত বড় মানুষ আপনি, অথচ একটা কুয়া থেকে পানি তুলতে পারতেছেন না? এই বইলা মেয়েটা কুয়ার পাশে গিয়া ভেতরে থুতু ফেলল। সাথে সাথে কুয়ার পানি উপরে উঠতে শুরু করল, উপচায়ে পড়তে শুরু করল পানি। সায়ক অবাক হইলেন এই ঘটনায়, কিন্তু কৌতুহল চাইপা রাইখা ওই পানিতে ওযু কইরা নামাজ আদায় করলেন।

নামাজের পর আলজাজুলি ওই মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এমন উঁচা মাকামে পৌঁছাইলা কেমনে? সে বলল, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম এর উপর বেশি বেশি সালাত ও সালাম পাঠ করার মাধ্যমে। এই উত্তর জাজুলিকে এতটাই নাড়া দিল যে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর সালাত ও সালামের যত গুরুত্বপূর্ণ দোয়া আর বর্ণনা তিনি সংগ্রহ করবেন সব এক জায়গায় করবেন, আর সেই সংগ্রহ থেকা নিজের মত করে লিখবেন দালাইল আল খাইরাত— নবীজির প্রতি ভালোবাসার এক দোয়া সংকলন।

Leave a Reply

dinduniya