View: 11

ইন্টেরিমের অর্ডিন্যান্স: নিজের বাপের থিকা সবক নেবেন নাকি হজরত তারেক রহমান?

ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সংসদীয় সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে তারেক রহমান ফ্যাসিজমের পুনরাবৃত্তি ঘটাবেন, নাকি বাবার পথ ধরে ইউনূস সরকারের সংস্কারগুলো স্থায়ী আইনি রূপ দিয়ে নতুন বাংলাদেশের প্রকৃত রূপকার হবেন।
পলিটিক্স

১৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়বেলা, ডক্টর মোহাম্মদ ইউনূস যখন প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়তেছেন, তার টেবিলের ওপর তখন শেষ ছয়টা অধ্যাদেশ। দেড় বছরের শাসনকালে জাগিয়ে দাঁড়াইছে মোট ১৩২টি অধ্যাদেশ এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশে! পার্লামেন্টের বাইরে, সংসদ যখন নাই, সে সময় আসলো এত এত নতুন আইন আর বিধি, স্রেফ প্রেসিডেন্টের আদেশে। যেই সংবিধান বহাল থাকল গণঅভ্যুত্থানের পরেও, তার ৯৩ নম্বর ধারায় বলা হইতেছে, অমন অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশ জারি করতে পারবে প্রেসিডেন্ট, কিন্তু তারপরে পার্লামেন্টের পয়লা বৈঠকেই তুলতে হবে। পার্লামেন্ট হয় অনুমোদন দেবে এবং নিয়মিত আইনে পরিণত হবে অথবা বাতিল হবে। আর অনুমোদন না দিলে বৈঠক শুরু হবার ৩০ দিন পরে অটোমেটিক বাতিল হয়ে যাবে।

এখন প্রশ্ন হইলো, এই যে ১২ মার্চ পার্লামেন্টের পয়লা বৈঠক বসতেছে, এই বৈঠকে ইন্টেরিম গভমেন্টের আমলের অর্ডিন্যান্সগুলোর ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেবে পার্লামেন্ট? এইখানে আমাদের মাথায় রাখা দরকার যে, পার্লামেন্ট বা সংসদ বলা হইলেও ব্যাপারটা আসলে একান্তভাবেই পিএম তথা উজিরে আজম তথা প্রধানমন্ত্রী হযরত তারেক রহমানের মর্জির ব্যাপার। কেননা পার্লামেন্টে তার দল বিএনপির এমপি আছে তিন ভাগের দুই ভাগেরও বেশি! তার মানে বিএনপি তথা তারেক রহমান একলাই যে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারে সংসদে। ইতিহাস বলতেছে, ঠিক একই রকম এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়াইয়া ছিলেন তারেক রহমানের বাবা, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৭৯ সালে তিনিও পাইছিলেন আগের কয়েক বছরের সকল অধ্যাদেশ; আমরা জানি, পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে ওইগুলোর বেশিরভাগ বৈধ করে নেওয়া হয়েছিল। জাতির নজর এখন প্রধানমন্ত্রীর ওপর—তিনি কি পারবেন বাকশালী ফ্যাসিজম উৎখাত করা, জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে পাওয়া ডক্টর ইউনূস সরকারের রাইখা যাওয়া সংস্কারগুলি নিজের কাঁধে তুইলা নিতে, নাকি সকল ক্ষমতা হাতে পাইয়া তিনি জাতীয় বাসনার উল্টা দিকে হাঁটবেন?

১৯৭৯ সালের ২ এপ্রিল থেকে দ্বিতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। এই সময় পার্লামেন্টের তাৎক্ষণিক কাজ ছিল ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত জারি হওয়া শত শত অধ্যাদেশের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জানতেন, রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হইলে এই অধ্যাদেশগুলোর সংসদীয় অনুমোদন জরুরি এবং তার দলের হাতেই আছে সংসদের নিয়ন্ত্রণ—৩০০ আসনের ভেতর বিএনপির এমপি ছিল ২০৭ জন। সেই অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ডিএমপি অধ্যাদেশ, যা আজও ঢাকা মহানগরীর নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। আবার সংবাদপত্র অধ্যাদেশ ও বাংলা একাডেমী অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাকশালী আমলের কঠোরতা কমাইয়া প্রতিষ্ঠানগুলারে নতুন প্রাণ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এছাড়া আইন সংস্কার ও বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশের মাধ্যমে একদিকে যেমন বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, অন্যদিকে তেমনি এনজিওগুলোর অর্থের ওপরও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পাশাপাশি খন্দকার মুশতাক আহমেদের জারি করা আলোচিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশও ছিল, যার এক নম্বর ধারা কইতেছে—১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ তারিখে ভোরে যে সকল ঘটনা ঘটেছিল, যার ফলে সরকার পরিবর্তিত হইয়াছে এবং সামরিক আইন জারি হইছে, সেই সকল ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ের জন্য কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না।

এইবার বর্তমানের দিকে তাকানো যাক। অন্তর্বর্তী সরকারের সমস্ত আদেশ-অধ্যাদেশ পার্লামেন্টে ৩০ দিনের মধ্যে পাস না হইলে সব অটোমেটিক্যালি বাতিল হইয়া যাবে। এখানেই শুরু নাটকীয়তা—বিএনপি কি এইসব সংস্কার মাইনে নেবে? এইখানে মনে রাখা দরকার, অন্তর্বর্তী সরকারের সব সংস্কারের সাথে বিএনপি শুরু থেকেই পুরোপুরি একমত ছিল না। জুলাই সনদে যেমন—সংসদের উচ্চকক্ষ, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা, ওদুদ, নির্বাচন কমিশনের প্রধান নিয়োগসহ বিভিন্ন প্রস্তাবে বিএনপির দ্বিমত আছে। জিয়াউর রহমান সামরিক আইনের অধ্যাদেশগুলারে একটা বড় ছাতার নিচে, তথা পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বৈধতা দিছিলেন—যে ধানের শীষে যেমন সিলটা দিবেন, ১২ তারিখে একই সাথে আপনাকে যে দ্বিতীয় ব্যালট পেপারটি দিবে হ্যাঁ এবং না, সেখানে হ্যাঁ এর পক্ষে দয়া করে আপনারা রায় দিবেন—উনি দিছিলেন, মানে ওনার দল বিএনপি পুরা কন্ট্রোলে থাকা পার্লামেন্টের পাশাপাশি সিভিল সোসাইটিতেও সে ব্যাপারে একটা ঐক্যমত ছিল।

এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের জনগণ দেশে পরিবর্তন চায়; আগের রাজনীতি বা আওয়ামী লীগের মতো বাকশালী স্বৈরাচার তারা আর দেখতে চায় না। ১২ই ফেব্রুয়ারির গণভোটের ভিতর দিয়া জনগণ তাদের সেই বাসনা জানাইছে। ফলে তারেক রহমানের সামনে রয়েছে কঠিন চ্যালেঞ্জ। তারেক রহমান যদি এই অধ্যাদেশগুলো পাস না করেন, তাইলে জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত রাষ্ট্র সংস্কার মুখ থুবড়ে পড়বে। আর যদি পাস করেন, তাইলে অনেক ক্ষেত্রেই নিজের দলের রাজনৈতিক স্বার্থের বিপরীতে গিয়া তাকে আপস করতে হবে। নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো পাস করা তারেক রহমানের জন্য জনপ্রিয়তার পরীক্ষা। দুদক, পিএসসি সহ বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কী আগের মতোই দলীয় সিদ্ধান্তে নিয়োগ হবে, নাকি জুলাই সনদ মোতাবেক বিরোধী দলের মতো এক্ষেত্রে বিবেচনা নিতে হবে? নাকি পুলিশের আওতায় পুলিশের রদবদল, নিয়োগ কী স্বাধীনভাবে হবে, নাকি আগের মতোই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথা মন্ত্রীর নির্দেশে হবে? জনস্বার্থের বিপরীতে সরকারি দল আর সিভিল সরকারের সাথে ব্যুরোক্রেসি সিন্ডিকেট বানাইয়া জনগণকে বন্দি করার পুরানো সংস্কৃতি কি তিনি ধইরা রাখবেন, নাকি বাবার মতো শক্ত হাতে প্রতিষ্ঠানগুলারে জনগণের খাদেম বানাইতে মন দেবেন—সেইটাই এখন প্রশ্ন।

আবার আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত অধ্যাদেশের বৈধতা দিয়ে ব্যাংক লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে ইউনূস সরকারের যে কঠোর অবস্থান, তা কি তারেক সরকার বহাল রাখবে? যদি রাখে, তাইলে বিপদে পড়তে পারে তার নিজের দলেরই অনেক নেতাকর্মী! তবে বিএনপির সেই রেকর্ড আছে—২০০২ থেকে ২০০৩ সালে অপারেশন ক্লিন হার্টের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার সরকার নিজ দলেরই বহু নেতাকর্মীরে ক্রসফায়ারে মাইরা ফেলেছিল। জিয়াউর রহমান অধ্যাদেশগুলারে স্থায়ী আইনে রূপান্তর করে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্থিতিশীল করে দরকারি অন্যান্য কাজে মনোযোগ দিছিলেন। হযরত তারেক রহমানের সামনে সেই সুযোগই হাজির হয়েছে আবার—অর্থাৎ ডক্টর ইউনূসের সংস্কারগুলোরে আইনের রূপ দিয়ে বাংলাদেশকে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তর করার।

তবে আগামীর ইতিহাস জানার তো কোনো উপায় নাই। ১৯৯৬ সালে সেই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল কইরা শেখ হাসিনা ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের ঘটনারে মুজিব খুন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে এবং সেই খুনের বিচার শুরু করে। পরে এমনকি সংবিধানে জিয়ার সেই ফিফথ অ্যামেন্ডমেন্টই বাতিল কইরা দেয় হাসিনার আদালত! তেমনি এই চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানকেও আওয়ামী বাকশালী ষড়যন্ত্র আর পুলিশ খুন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইতেছে। ইন্টেরিমের অধ্যাদেশ এবং জুলাই সনদে অভ্যুত্থানের স্বীকৃতি আছে; ফলে নয়া সংবিধানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের নয়া বন্দোবস্ত পুরোপুরি না ঘটলেও অভ্যুত্থানে ছাত্রজনতার দায়মুক্তি আছে। অটোমেটিক ইতিহাস তারেক রহমানরে কীভাবে মনে রাখবে, তা নির্ভর করতেছে সংসদের বৈঠক শুরু হবার পরের ৩০ দিনে নেওয়া সংসদীয় সিদ্ধান্তের ওপর। তিনি কি সংবিধানে ফ্যাসিজমের বীজে পানি দেবেন, নাকি হবেন নতুন বাংলাদেশের রূপকার? তার বর্তমান রাজনৈতিক দুশমনদের শায়েস্তা করতে তিনি কি বাকশালী ফ্যাসিজমের জন্য চোরাগুলি বানাইয়া রাখবেন—এই রাষ্ট্রব্যবস্থায় চোখা নজর রাখতেছে জনগণ আর আগামীর ইতিহাস।

দিন দুনিয়া

Leave a Reply

dinduniya

Share with