View: 3

স্ল্যাং কি স্রেফ গালাগালি নাকি পাওয়ার ডাইন্যামিক্সের খেলা?

সমাজ যখন নীতিকথা আর ফরমাল বুলির আড়ালে মুখ লুকায়, তখন মানুষের আসল ক্ষোভ আর বিদ্রোহ প্রকাশ পায় কেবল স্ল্যাংয়ের ধারালো ভাষায়!
আর্ট-কালচার

ভাইরাল এই ভিডিও ক্লিপটা হয়তো দেখছেন। নীতিকথা কপচানো এক সাংবাদিকরে উচিত জবাব দিছে এক মহিলা। তবে উচিত জবাব দেওয়ায় কি ভাইরাল হওয়ার একমাত্র কারণ, নাকি স্ল্যাং এখানে একটা ইম্পরটেন্ট রোল প্লে করছে? তো কেন এই ভিডিও ক্লিপটা ভাইরাল, আর স্ল্যাং এইখানে কী রোল প্লে করছে? চলেন জানি।

সাধারণত স্ল্যাংরে আমরা দেখি অশ্লীলতা, অসভ্যতার সিম্বল হিসেবে; বাজে শব্দ বা ছোটলোকের ভাষা হিসেবে। কিন্তু আসলে কি তাই? স্ল্যাং হইতেছে ল্যাঙ্গুয়েজের এমন একটা রূপ, যা গ্রামার বা ডিকশনারির নিয়ম মাইনা চলে না। এটা মানুষের মুখে মুখে গড়ে ওঠা ইনফরমাল কিছু শব্দ বা শব্দসমষ্টি। স্ল্যাং নির্দিষ্ট থাকে না সবসময়, আর যেটা স্ল্যাং, ১০ বছর পর সেটা গিয়ে ফরমাল শব্দ হয়ে উঠতে পারে। “কোন ধরনের ডেসপিকেবল আপনাদেরকে চালায় একবার চিন্তা করুন, হালার গোয়ালা।”—ইংরেজি মারা নেই।

স্ল্যাং এক্সপার্ট ও লেক্সিকোগ্রাফার জনাথন গ্রীনের বিখ্যাত কাজ ‘দ্য ভালগার টাং’। গ্রীন সাহেবের ঢাউজ সাইজের ডিকশনারি খেয়াল করলে দেখবেন, স্ল্যাং নিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাইয়া গেছে। গ্রীনসহ সকল লেক্সিকোগ্রাফারের কাছে স্ল্যাং সব গালি বা বাজে শব্দ না। কালচারের যেমন কাউন্টার কালচার থাকে, ভাষারও তেমনি থাকে প্রতিভাষা বা কাউন্টার ল্যাঙ্গুয়েজ। ফরমাল ভাষা আমাদের রিয়েল অনুভূতি, জিদ বা ক্ষোবের তীব্রতা অতটা সামনে আনতে পারে না, যেটা স্ল্যাং পারে। তাই বইলা এটারে গরিব বা নিচ জাতের ভাষা ভাবলে ভুল হবে! বরং এইটাই হইলো আমার-আপনার সবচেয়ে লাইভলি এক্সপ্রেশন।

ফরাসি সাহিত্যিক বালজাকের মতে, স্ল্যাংয়ের মতো কালারফুল আর এনার্জেটিক কোনো ভাষা আর হয় না। এনার্জেটিক হওয়ার কারণেই বাঁধাধরা নিয়মের বাইরে গিয়া আমাদের ভেতরকার বিদ্রোহটারে স্ল্যাং ডিরেক্ট প্রকাশ করতে পারে—”কালকে-কালে খিচু আরাম!” খেয়াল করেন, ভাইরাল ভিডিওর এই মহিলা একই কাজ করছে: “আমার কাজের টাকা দিয়ে আমি নেশা করি, নাইলে থুইয়া দেই, এটা তো আপনার লাভ নাই!” ভদ্রতার গ্রামার ভাইঙ্গা নিজের ক্ষোভটা সরাসরি প্রকাশ করছে।

গ্রীন দেখাইছেন যে, স্ল্যাংয়ের জন্ম মূলত মেইনস্ট্রিমের বাইরের মানুষের হাত ধইরা। কেন? কারণ সোসাইটির মূল ধারার ভাষা তাদের রিপ্রেজেন্ট করতো না। এখানে স্ল্যাং হয়ে উঠলো এক ধরনের লিঙ্গুইস্টিক রেবেলিয়ন বা ভাষাগত বিদ্রোহ। যারা ক্ষমতার বাইরে থাকে, তারা নিজেদের আলাদা পরিচয় আর একাত্মতা তৈরি করতেও স্ল্যাং ব্যবহার করে। সোজা কথায়, স্ল্যাং হইলো সেই ভাষা, যা ভদ্র সমাজের নিয়মরে বুড়া আঙুল দেখায়।

এবার চলেন, গালি নিয়া বাঙালি গবেষক অভ্র বসু কী বলতেছেন সেটা দেখি। ‘বাংলা স্ল্যাং’ বইয়ে বসু বলতেছেন, স্ল্যাং হইলো ভাষার এমন একটা গতিশীল অংশ, যা সাধারণ মানুষের মুখে জন্ম নেয়। মাগী বা রাারের মতো অনেক শব্দ একসময় স্বাভাবিক হিসেবেই পরিচিত ছিল, কালের বিবর্তনে সেগুলা এখন গালিতে পরিণত হইছে। বসুর মতে, কোনো ভাষারে পুরোপুরি বুঝতে হলে তার ব্রাত্য বা অশিষ্ট শব্দগুলোকেও জানা প্রয়োজন। শুধু রবীন্দ্র-নজরুলের মার্জিত ভাষা দিয়া একটা জাতির পুরো ভাষাম্যাপ তৈরি সম্ভব না। মেহনতী মানুষের কথা, তাদের ক্ষোভ এবং আবেগের বহিঃপ্রকাশ এই স্ল্যাংগুলোর মধ্যেই থাকে—”কুত্তার বাচ্চা, কুত্তার বাচ্চা!”

ফরমাল ল্যাঙ্গুয়েজে যেটা প্রকাশ করতে ১০টা বাক্য লাগে, সেই তীব্রতা এক শব্দে প্রকাশ করে স্ল্যাং। শুরুর ভাইরাল ক্লিপটার কথাই ধরেন—কেন এই ব্যক্তি প্রমিত ভাষায় কথা না বইলা স্ল্যাং ব্যবহার করলেন? কারণ তার বিরক্তি বা ক্ষোভ প্রকাশের আর কোনো শর্টকাট ছিল না। এটা পাওয়ার ডায়নামিক্সের একটা খেলাইও। ভিডিওর লোকটা যখন ‘বাল’ শব্দটা ইউজ করতেছে, তখন সে শুধু একটা শব্দ বলতেছে না; সে কিন্তু সাংবাদিকের এথিক্যাল সুপেরিয়রিটি বা নীতিকথার গাম্ভীর্যরে এক নিমিষে ধসায়া দিতেছে! এইটাই স্ল্যাংয়ের ক্ষমতা। ফরমাল ভাষা যখন অনেক সময় উপরতলা বা অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে, স্ল্যাং তখন প্রান্তিক মানুষের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে। গ্রামার বা এলিটিজমরে ফ্লায়িং কিক মাইরা মানুষ তার অনুভূতির সর্বোচ্চটা প্রকাশ করতে বাছে নিতে পারে স্ল্যাং—”ওস্তাদের মাইর শেষ রাইতে!”

তখন আপনার মনে একটা প্রশ্ন আসতে পারে—স্ল্যাং কি তাহলে শুধু রাগ-ক্ষোভ প্রকাশ করার অস্ত্র? না, স্ল্যাং আর গালি কিন্তু এক না! আপনি যখন বন্ধুদের সাথে আড্ডায় স্ল্যাং ইউজ করেন, তখন কিন্তু সেটা আর গালি থাকে না, বরং হয়ে ওঠে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার ব্যাপার। এমনকি কোনো নির্দিষ্ট স্ল্যাং আপনার নির্দিষ্ট গ্রুপ বা কমিউনিটিতে বিলং করার পরিচয়ও তৈরি করে—”হায় হায় ওস্তাদ, কাম হয়ে গেছে, গু আমার আশায়!”

ট্যাবু ব্রেক করতেও স্ল্যাং হেল্প করে। মানে সমাজ যেতি নিয়ে কথা বলতে দ্বিধা করে, স্ল্যাং সরাসরি সেই বিষয়গুলোরে অ্যাড্রেস করে। অনেক সময় স্ল্যাং কৃত্রিমতার মুখোশ খুলে ফেলার হাতিয়ারও! ফরমাল ভাষা যেখানে আরষ্ট, স্ল্যাং সেইখানে ক্ষোভ বা তীব্র আবেগ প্রকাশের মোক্ষম টুল। স্ল্যাং অফার করে ক্রিয়েটিভ ফ্রিডম—”ইংরেজি বিরক্ত লাগে!”

দর্শক, আপনার প্রিয় বা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত স্ল্যাং কোনটা, কমেন্টে জানান। “কুত্তার বাচ্চা, কুত্তার বাচ্চা, টেলিফোন রাখ!

দিন দুনিয়া

Leave a Reply

dinduniya

Share with