লস এঞ্জেলস ভাবলে আমাদের মাথায় আসে হলিউড আর বেভারলি হিলসের কথা, মুম্বাই ভাবলে বলিউড আর কলকাতা ভাবলে হলুদ ট্যাক্সি। প্রতিটা শহরের ইউনিক আইডেন্টিটির সাথে মিশে থাকে নির্দিষ্ট কিছু জিনিসপাতি। রিক্সা তেমনি ঢাকার নিজস্ব আইডেন্টিটি, ‘সিটি অফ রিক্সা’ই বলে ঢাকারে। রিক্সার সাথে রিক্সা পেইন্টের মতো একটা দারুন জিনিসও আমরা পাইছি। আজকাল পপুলার হয়ে উঠছে নতুন এক ট্রেন্ড—পাবলিক ট্রান্সপোর্টের গায়ে লেখা ধর্ম, দর্শন ও নীতিকথার টেক্সট। ঢাকার রাস্তায় এখন পাবলিক ট্রান্সপোর্টের দিকে তাকাইলে মনে হয় কোনো উন্মুক্ত লাইব্রেরির মধ্যে দাঁড়ায় আছি!
ঠিক কবে থেকা আমাদের পাবলিক ট্রান্সপোর্টগুলো হয়ে উঠলো এমন নীতিকথার বিলবোর্ড আর কিভাবেই বা হইলো, চলেন জানি। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে দেশে ফরমাল আর্টের পাশাপাশি আরেকটা জিনিস ডালপালা মেলতেছিল—ইনফরমাল আর্ট। ঢাকার গ্যারেজগুলায় জন্ম নিতেছিল রিক্সা পেইন্টের মতো খাঁটি এক পপ আর্ট। আর কে দাস, আলী নূর, দাউদ ওস্তাদ, আলাউদ্দিনের মতো রিক্সা আর্টিস্টদের হাত ধইরা এইখানে দাঁড়ায় গেল একটা ইউনিক পেইন্টিং স্টাইল। শুধু রিক্সা না, এই আর্টিস্টরা ট্রাকের বডি আর সিনেমার বড় বড় ব্যানার-পোস্টারও আঁকত। ষাটের দশকে এসব পেইন্টিংয়ে সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের দাপটটাই ছিল বেশি।
স্বাধীনতার পরপর ক্যানভাসটা একটু বদলাইলো। পেইন্টিংয়ে আসতে থাকলো মুক্তিযুদ্ধ আর নতুন রাজধানী হিসেবে ঢাকার কাল্পনিক সব ছবি। তবে এসবের পাশাপাশি গ্রামের মানুষজন, ক্ষেত-খামার, ফুল, পাখি—এইসবও আঁকা হইতো। এই সময়ে অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটে। রিক্সায় মানুষের ছবি আঁকায় আসতে থাকে সরকারি বাধা। প্রথমবার এই ঘটনা ঘটে পাকিস্তান আমলে, ১৯৭০ সালের দিকে। রিক্সার পাছায় হস্তক্ষেপ করে পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ করে দেয় মানুষের ছবি আঁকা। দ্বিতীয়বার ঘটে সত্তরের দশকে খন্দকার মোশতাকের আমলে। রিক্সা পেইন্টার আর কে দাস বলছেন, রিক্সায় মানুষের ছবি থাকলে পৌরসভা কালি দিয়া ক্রস দিতো এবং বলতো ছবি না বদলাইলে লাইসেন্স রিনিউ হবে না। রাষ্ট্র মানুষের ছবি আঁকা নিষেধ কইরা দিল।
কিন্তু আর্টিস্টরা কি থাইমে গেল? না! তারা তখন আঁকলো এমন ছবি, যেখানে ট্রাফিক কন্ট্রোল করতেছে শিয়াল, রাস্তা দিয়ে হাইটে যাইতেছে বাঘ কিংবা কাঁধে ব্যাগ ঝুলায়া স্কুলে যাইতেছে খরগোশ। অর্থাৎ মানুষ আঁকা নিষেধ, তাই মানুষের বৈশিষ্ট্যই তারা ঢুকায় দিল প্রাণীর ভেতর। এই অ্যানথ্রোপমরফিক আর্টের মাধ্যমে সরকারের নিষেধাজ্ঞারে বুড়া আঙুল দেখাইল আর্টিস্টরা। ১৯৮৩ সালে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উইঠা যায়। মানুষের ছবি আবার জোরেশোরে ফিরে আসে রিক্সা পেইন্টে। সেই সাথে বাড়তে থাকে মক্কা-মদিনার ছবি, ক্যালিগ্রাফি আর ধর্মীয় বাণী। বিভিন্ন মিথ বা ধর্মীয় কিচ্ছাকাহিনী বিষয় কইরাও রিক্সায় ছবি আঁকা হইতে থাকলো। মুসলিম উপাখ্যানের দুলদুল, বোরাক, আরব রজনীর আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ কিংবা দৈত্য, রাজকন্যা, রাজপ্রাসাদ—এসব হয়ে উঠলো হট কেক।
আশির দশকে রিক্সা ও বাস-ট্রাকের পাছা চইলা যায় সরকার আর এনজিওর দখলে। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বিশাল এরিয়া কাভার করে বইলা সরকার ও এনজিও পাবলিক ট্রান্সপোর্টেই বানাইলো তাদের ক্যাম্পেইনের মিডিয়াম। আপনার সন্তানকে টিকা দিন, গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান কিংবা আপনার সন্তানকে স্কুলে পাঠান—স্লোগানগুলো ঠাঁই পাইতে শুরু করল বাস, ট্রাক, রিক্সার পাছায়। টিভি আর ইন্টারনেটের যুগ না হওয়ায় পরবর্তীতে এইটাই স্থায়ী ট্রেন্ডে পরিণত হইল।
ধীরে ধীরে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে কমতে থাকে রিক্সা ইমেজের ডিমান্ড, বাড়তে থাকে টেক্সটের আধিক্য। মোস্টলি রিক্সা পেইন্টাররা তখন সার্ভাইভ করতেছিল সিনেমার পোস্টার, ব্যানার বানায়া। কিন্তু শূন্য দশকে আইসা যখন ডিজিটাল পেইন্টিং চালু হইলো, তখন সিনেমার ব্যানারেও রিক্সা পেইন্টিংয়ের ডিমান্ড কমে গেল। এরই ধারাবাহিকতায় ক্রমান্বয়ে হারায়ে গেছে রিক্সা পেইন্ট, আর সেই জায়গা নিয়ে নিছে টেক্সট। ধর্ম, দর্শন, নৈতিকতা—সব বিষয়ে এখন লেখা হইতেছে পাবলিক ট্রান্সপোর্টের বডিতে।
প্রশ্ন হলো, বাস, রিক্সা, সিএনজির পাছায় আজকাল নীতিকথা বাড়তেছে কেন? এই চলমান বিলবোর্ডগুলার পেছনের ড্রাইভার, মালিক এবং সাধারণ মানুষের গভীর কিছু মানসিক দিক কাজ করে। দেশের পরিবহন খাত নিয়ে অনেক সমালোচনা আছে; বেপরোয়া ড্রাইভিং, ফিটনেসবিহীন গাড়ি আর ট্রাফিক অমান্য করার ঘটনা অহরহ, প্রতিদিনই ঘটতেছে নানান দুর্ঘটনা। অনেক ড্রাইভার বা মালিক সাবকনশাসলি এই ধরনের গিল্ট ট্রিপে থাকে। বাসের পেছনে ‘আল্লাহ সর্বশক্তিমান’, ‘মায়ের দোয়া’ কিংবা ‘বিবেকের শ্রেষ্ঠ আদালত’ লিখে তারা হয়তো এক ধরনের মানসিক স্বস্তি ফিল করতে চায়।
মজার ব্যাপার কি জানেন? বেশি নীতিবাক্য লেখা গাড়িটায় হয়তো ট্রাফিক আইন ভাঙতেছে সবচেয়ে বেশি! পেছনে ‘ধৈর্য ধারণ করুন’ লেখা বাসটা হয়তো জ্যামের মধ্যে লাগাতার হাইড্রোলিক হর্ন বাজাইতেছে। ‘বিবেকের শ্রেষ্ঠ আদালত’ লেখা বাসের ড্রাইভারই হয়তো আরেকটা বাসরে ওভারটেক করতে গিয়ে অন্যদের জীবন ঝুঁকিতে ফালাইতেছে। এই যে আইরনি, এইটা আসলে আমাদের সমাজেরই একটা খন্ডচিত্র।
অন্যদিকে, হাইওয়েতে যখন একটা ট্রাক বা বাস চলে, ড্রাইভার জানে যে কোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এই চরম অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচতে তারা কপাল বা ভাগ্যের উপর ভরসা করে বেশি। ‘আল্লাহ সর্বশক্তিমান’ বা ‘মায়ের দোয়া’ একজন ড্রাইভারের কাছে কেবল লেখাই না, এগুলা তার কাছে হয়তো একেকটা তাবিজ! সে বিশ্বাস করে লাইনগুলা তারে রোড এক্সিডেন্ট বা বদনজর থেকে বাঁচাবে।
রিক্সা পেইন্ট ছিল আমাদের নিজস্ব ভাষা। কোনো স্কুল নাই, কোনো থিওরি নাই—শুধু রং আর শিল্পীর সাহস। সেই ভাষা ও স্টাইলের জায়গাটা এখন নিতেছে নীতিকথা আর উপদেশবাণী। অথচ দেশের মানুষের অন্যায়, দুর্নীতি আর নৈতিক স্খলন দেখলে বোঝা যায়, এই লেখাগুলা না লিখনেওয়ালার কাজে আসতেছে, না পড়নেওয়ালার। আমরা হারাইতেছি পপ আর্টের একটা ইউনিক লেগাসি আর বিনিময়ে পাইতেছি গাদাগাদাঁ অদরকারি উপদেশ!
Leave a Reply