View: 7

সিলসিলা: সুফি তরিকার গ্লোবাল হিস্ট্রি | এপিসোড-১

সুফি কথাটা শুনলে প্রথমেই কোন ইমেজটা আপনার মনে আসে? একদল সমাজত্যাগী মানুষ যারা দ্বীন দুনিয়া ভুইলা কোন এক কোণে বইসা কেবল জিকির ফিকির আর মোরাকাবা করেন।
সিলসিলা

সুফি কথাটা শুনলে প্রথমেই কোন ইমেজটা আপনার মনে আসে? একদল সমাজত্যাগী মানুষ যারা দ্বীন দুনিয়া ভুইলা কোন এক কোণে বইসা কেবল জিকির ফিকির আর মোরাকাবা করেন। কিন্তু যদি বলি লিবিয়ার মরুভূমি থেকে শুরু করে ককেশাস বরফ ঢাকা পর্বতমালা পর্যন্ত ইতিহাসের সবচাইতে বড় আর ভয়ঙ্কর অ্যান্টি-কলোনিয়াল সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন এই সুফিরাই।

অন্যান্য আধ্যাত্মিক ধারায় যেখানে সাধক হওয়া মানে ঘর সংসার, বিয়ে শাদী বা কামাই রোজগার ছেড়ে দেওয়া, সুফিরা এর কোনটাই বাদ দেন নাই। তারা একদিকে যেমন ছিলেন অন্তর্মুখী সাধক, অন্যদিকে ছিলেন সমাজের অতন্দ্র প্রহরী। তাহলে এই আপাত বৈপরিত্বের রহস্যটা কি? কিভাবে একই মানুষ একই সাথে পরম শান্তিবাদী সাধক এবং আপসহীন যোদ্ধা হয়ে উঠতে পারেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের ভেতরের এক চিরন্তন লড়াইয়ের মধ্যে।

ইতিহাসের শুরু থেকেই স্পিরিচুয়ালিটি মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। হাজার বছর ধরে মানুষ এই রিয়েলিটিরে ডিনাই করে নাই। সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে— সে আসলে কে? কেন সে এই দুনিয়ায় আসলো? তার জীবনের লক্ষ্যই বা কি? আরো সহজ ভাষায়, এই যে জীবনে আমরা ঘরে বাইরে এত প্যারা খাই, এত কামাই রোজগারের ইদুর দৌড়, যুদ্ধ বিগ্রহ, মহামারি আর অর্থনৈতিক উত্থান পতন— এত কিছুর পর দিনশেষে মনের ভেতরে যে একটা তীব্র শূন্যতা আর হাহাকার জেগে ওঠে, তার সমাধান কোথায়?

মডার্নিটি আসার পর মানুষের এই রুহু আর রুহানিয়াত নিয়ে চিন্তায় বড় একটা ভাটা পড়েছে। এগ্রেসিভ ম্যাটেরিয়ালিজমের আড়ালে আমরা এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো ভুলতে বসেছি। আজকের মডার্ন দুনিয়া মানুষকে সেগমেন্টেড বা টুকরো টুকরো করে ফেলতেছে। মানুষের বডি থেকে তার রুহকে আলাদা করছে, মাইন্ড থেকে আলাদা করছে বডিকে। এইরকম একটা সেগমেন্টেড ঢাচে থাকার কারণে আধুনিক মানুষ তীব্র আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগতেছে। একটা গ্যাস লাইটিং অবস্থার মধ্যে পড়ে মানুষ তার জীবনের হিসাব মিলাইতে পারতেছে না। এই যুগে লেবাস বা বাহ্যিক খোলস হয়তো আছে, কিন্তু ভেতরের এসেন্স হারায়ে গেছে। হাকিকত হইলো আমাদের বডি, মাইন্ড আর স্পিরিট একই সুতায় বাঁধা।

এই হিউম্যান কন্ডিশন আজকে আমরা টের পাইলেও সুফিরা হাজার বছর আগেই এই মনস্তাত্বিক সংকট বুঝতে পারছিলেন। আর মানুষের এই খাদে পড়ে যাওয়া ঠেকাইতে তারা নিয়ে আসছেন একটা সিস্টেমেটিক সমাধান।

একাডেমিক দুনিয়ায় একে বলে সুফিজম, কিন্তু প্র্যাকটিসিং সুফিরা বলেন তাসাউফ। তাসাউফের আক্ষরিক অর্থ পবিত্রতা বা পশমী বস্ত্র পরিধানের সাধনা হলেও এর মূল নির্যাস হইল প্রেম, ভক্তি আর আত্মার పరిశুদ্ধির মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার একটা ডিরেক্ট আর পার্সোনাল এক্সপেরিয়েন্স লাভ করা। সুফিরা এই অভিজ্ঞতায় পৌঁছানোর জন্য একটা বিশেষ শব্দ ইউজ করেন— ‘ধাওক’, যার মানে হলো আস্বাদন বা সরাসরি আধ্যাত্মিক উপলব্ধি। এইটা কোন থিওরিটিক্যাল বা কেতাবী বিদ্যা না, পুরাপুরি ফিল করার ব্যাপার।

এখন প্রশ্ন হইল, এই ধাওক বা ডিরেক্ট এক্সপেরিয়েন্স তো আর এমনি এমনি বাতাসে ভেসে আসে না, এর জন্য একটা নির্দিষ্ট মেথড বা স্কুলিং লাগে। এই সিস্টেমটার নামই হইলো তরিকা, যার আক্ষরিক অর্থ পথ বা পদ্ধতি। বিখ্যাত দার্শনিক ও সুফি সাইয়েদ হোসাইন নাসের চমৎকার একটা জ্যামেতিক মেটাফোর ব্যবহার করছেন। একটা বৃত্তের পরিধি যদি হয় শরিয়া আর কেন্দ্র যদি হয় হাকিকা বা পরম সত্য, তাহলে এই পরিধি থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সংযোগকারী যে ব্যাসার্ধ বা রেখা সেটাই হলো তরিকা। অর্থাৎ তরিকা হইলো বাইরের আনুষ্ঠানিকতা থেকে ভেতরের গভীর উপলব্ধিতে যাওয়ার রাস্তা। প্রখ্যাত স্কলার উইলিয়াম চিত্তিকের মতে, তরিকা কেবল পাপ থেকে বেঁচে থাকার নাম না, কলবের একটা সিস্টেমেটিক কারিকুলাম, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ‘তাল্লুক বি আখলাক আল্লাহ’— অর্থাৎ আল্লাহর গুণাবলীতে গুণান্বিত হওয়া, মানুষের ভেতরে দয়া, ক্ষমা আর ভালোবাসার মত ডিভাইন কোয়ালিটি গুলোকে জাগায়ে তোলা।

যেকোনো ভ্যালিড তরিকার কয়েকটা কোর কম্পোনেন্ট থাকে— যেমন মুরিদ, মুর্শিদ, বায়াত ও সিলসিলা। সিলসিলা মানে একটা অবিচ্ছেদ্য আধ্যাত্মিক শিকল, যা বর্তমানের শায়ক থেকে শুরু করে একদম ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। এই চেইনে যুক্ত হওয়া মানে সরাসরি সেই রুহানি আলোর সাথে কানেক্টেড হওয়া।

এইখানে একটা প্রশ্ন প্রায়ই ওঠে— নিজে নিজে বই পড়ে বা ইবাদত করে কি এই রুহানি উন্নতি সম্ভব না? একজন পীর বা মুর্শিদ বা গাইডের হাত কেন ধরতে হবে? সুফিজমের মনস্তাত্বিক উত্তরটা খুব গভীর। মানুষের নফস বা ইগো খুব ধূর্ত, সে সহজেই মানুষকে ধোঁকা দেয়। হয়তো আপনি ভাবছেন আপনি খুব বড় আধ্যাত্মিক সাধক হয়ে গেছেন, অথচ ভেতরে ভেতরে সূক্ষ অহংকার আপনাকে ধ্বংস করে দিতেছে। এইখানেই দরকার একজন কামেল গাইড বা স্পিরিচুয়াল মেন্টরের, যিনি আপনার ইগোর ফাঁদ থেকে আপনাকে সেফলি বের করে আনবেন। এই সিস্টেমে ওস্তাদকে বলা হয় পীর বা শায়ক, আর ছাত্রকে বলা হয় মুরিদ বা সালেক।

কম্পিউটার সাইন্সে একটা কথা আছে— গার্বেজ ইন, গার্বেজ আউট। অর্থাৎ ভেতরে আবর্জনা ঢুকলে আবর্জনাই বের হবে। সুফিরা যেহেতু তাসকিয়াতুল নফস বা অন্তর পরিষ্কারের কাজ করেন, তাই তাদের ভেতরের এই বিউটি বা সৌন্দর্য বাইরের দুনিয়াতেও প্রকাশ পাইতো। ইতিহাসে তাকাইলে আমরা দেখবো, ইসলামী দুনিয়ার আর্ট, ক্রাফট আর আর্কিটেকচারের পেছনের অধিকাংশ কারিগর বা ডিজাইনার ছিলেন কোন না কোন সুফি তরিকার মুরিদ। অনেকে তো মোরাকাবার মাধ্যমে এই ডিজাইনগুলার ডিভাইন ইন্সপিরেশন পাইতেন।

কিন্তু সুফিদের অবদান কি শুধু আর্টেই সীমাবদ্ধ ছিল? মোটেই না। তাদের আস্তানা বা খানকা এবং জাউয়াগুলা ছিল তখনকার সমাজের সবচেয়ে বড় সোশ্যাল সেফটি নেট। সেইখানে ছিল মুসাফির আর অভাবীদের জন্য ২৪ ঘন্টা ফ্রি লঙ্গরখানা, ফ্রিতে দ্বীনি ও রুহানি তালিম। তরিকাগুলাতে নিজ হাতে কাজ করাকে গুরুত্ব দেওয়ায় মুরিদদের ফ্রিতে বিভিন্ন ক্রাফট বা শিল্প শেখানো হতো, যা সমাজ থেকে বেকারত্ব দূর করত।

সবচেয়ে বড় কথা, তরিকাগুলা সমাজে একটা খাঁটি কমিউনিটি ফিলিং বা ব্রাদারহুড টিকায়ে রাখতো। সপ্তাহে অন্তত একদিন জিকির বা হাদারার উসিলায় সমাজের সব স্তরের মানুষ এক লাইনে আইসা বসতো। নারীদের জন্য ছিল সিস্টারহুডের নিজস্ব স্পেস। আজ যখন কর্পোরেট দুনিয়ায় আমরা একাকিত্বের শিকার, তখন হাজার বছর আগে সুফিরা তৈরি করেছিলেন এই সামাজিক নিরাপত্তার নেটওয়ার্ক।

এমনকি ক্ষমতার ভারসাম্য ধরে রাখতেও তারা ভূমিকা রাখছেন। অনেক সুফি মাস্টার শাসকদের খুব কাছাকাছি থাকতেন— ক্ষমতার লোভে না, বরং শাসক যাতে জালিম না হয়ে ওঠে, সমাজে যাতে আদল বা জাস্টিস বজায় থাকে, সেই চেক এন্ড ব্যালেন্সটা ধরে রাখার জন্য। সুলতান নুরুদ্দিন জঙ্গি কিংবা সালাউদ্দিন আইয়ুবীর মত গ্রেট লিডারদের নৈতিক গঠনে সুফি মাস্টারদের বিরাট ভূমিকা ছিল।

এতক্ষণ শুনে মনে হইতে পারে সুফিরা বুঝি কেবলই নরম মনের কিছু মানুষ, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াইতে জানেন না। কিন্তু এইটা সুফিজমকে পশ্চিমা চশমা দিয়ে দেখার ফল। ওয়েস্টার্ন ওরিয়েন্টালিস্টরা সুফিজমের এমন একটা প্যাসিভ ন্যারেটিভ দাঁড় করাইছে, যেন তারা শুধু লাভ এন্ড পিস নিয়ে থিওরিটিক্যাল আলাপ করে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টাইলে দেখা যাবে, ইউরোপ যখন মুসলিম বিশ্বে কলোনি বা উপনিবেশ গড়ার প্রজেক্ট নিয়ে এলো, তখন প্রথম সারির সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন এই সুফি সাধকেরাই। তারা কেবল নফসের বিরুদ্ধে আধ্যাত্মিক জিহাদেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, দেশের প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে মাঠে নেমেছিলেন।

লিবিয়ায় ইতালীর বিরুদ্ধে লড়াই করা সিংহপুরুষ ওমর আল মুক্তার ছিলেন সানুসি সুফি তরিকার শায়ক। আলজেরিয়ায় ফ্রান্সের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করা আমির আব্দুল কাদের ছিলেন কাদেরিয়া তরিকার। কাস্পিয়ান অঞ্চলের চেচনিয়ায় রাশিয়ার জানপ্রাণ কেড়ে নেওয়া ইমাম শামিল ছিলেন নকশবন্দী তরিকার। এছাড়া ওয়েস্ট আফ্রিকায় আলহাজ্ব ওমর তাল, সেনেগালের শেখ আহমদ বাম্বা, সুদানের মোহাম্মদ আহমদ কিংবা সাউথ এশিয়ায় বেরেলবি আন্দোলন থেকে শুরু করে আফগানিস্তানের রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যোদ্ধাদের এক বিশাল অংশই ছিলেন বিভিন্ন সুফি তরিকার মুর্শিদ ও মুরিদ। সুফিজম আসলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আত্মিক ও জাগতিক উভয় লড়াইয়ের এক আপোশহীন নাম।

তাহলে ভাবেন, আজকের এই কর্পোরেট মেটেরিয়ালিস্টিক যুগে বইসা কেন আমাদের সুফি তরিকার ইতিহাস জানা দরকার? কারণ বর্তমান দুনিয়ায় সুফিজমের নামে যে ব্যবসা, ভন্ডামি ও অপব্যাখ্যা আমরা দেখি, তার সাথে আসল ইতিহাসের একটা প্যারালাল কম্পারিজন করা দরকার। যেই জামানায় এক গ্লাস পানি পর্যন্ত কিনে খাইতে হয়, সেইখানে হাজার বছর ধরে চলা এই নিঃস্বার্থ খিদমতের ট্রেডিশনটা বোঝা দরকার। ফ্রিডমের নেশায় পাগল আর পারসুট অফ হ্যাপিনেসের দোটানায় যখন আমরা দিশেহারা, তখন এই বুজুর্গদের হাজার বছরের নসিহতের মধ্যে আমরা পাইতে পারি দিশা।

‘সিলসিলা: সুফি তরিকার গ্লোবাল হিস্ট্রি’— এই সিরিজে আমরা ইতিহাসের সেই আদি বিন্দুতে ফিরে যাব, যেখানে সুফিজম তরিকা হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে শুরু করছিল। সেখান থেকে আমরা একে একে আলাপ করব পৃথিবীর প্রধান পাঁচটি সুফি তরিকা— কাদেরিয়া, চিশতিয়া, সাদিলিয়া, নকশবন্দীয়া ও মেভলেভিয়া নিয়ে। আর এই সিরিজের একটি বিশেষ এপিসোড থাকবে শুধুমাত্র আমাদের এই পলিমাটির দেশ বাংলাদেশের সুফি ঐতিহ্যের উপর। আমরা দেখবো এই দেশের সমাজ ও সংস্কৃতি গঠনে এই তরিকাগুলো অতীতে কি ভূমিকা রাখছিল আর আজই বা তাদের প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু। তরিকাগুলোর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত সিস্টেমেটিক এই রুহানি কারিকুলাম আর ইতিহাসের অদেখা অধ্যায়গুলো জানতে আমাদের এই সিরিজের সাথেই থাকেন। দেখা হবে নেক্সট এপিসোডে।

দিন দুনিয়া

Leave a Reply

dinduniya

Share with